বছর জুড়েই আলোচনায় শাবি

জুবায়েদুল হক রবিন, শাবি ::


একযুগ পর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় সমাবর্তন, অনলাইন ক্লাসের বিপক্ষে প্রশাসনের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা, সর্বশেষ হল খোলার দাবিতে শিক্ষার্থীদের টানা বিক্ষোভসহ বেশকিছু কারণে বছরের পুরোটা সময়ই দেশজুড়ে আলোচনায় ছিলো শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবি)। তবে এতোসব আলোচনার মাঝে বিভিন্ন জাতীয় পুরস্কার লাভ, করোনাকালীন সময়ে মানবিকতার দৃষ্টান্ত, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শিক্ষার্থীদের সফলতাসহ বিভিন্ন সফলতা বাড়িয়ে দিয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়টির পরিচিতি।

বহুল প্রতীক্ষিত তৃতীয় সমাবর্তন : একযুগ পর গত ৮ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুল প্রতীক্ষিত সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে অনুষ্ঠিত হয় সমাবর্তনের মূল আনুষ্ঠানিকতা। সমাবর্তন অনুষ্ঠানের উদ্বোধন ঘোষণা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ও রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। সমাবর্তন বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন লেখক-শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। সমাবর্তনে রেজিস্ট্রেশন করে মোট ৬ হাজার ৭৫০ জন শিক্ষার্থী। সমাবর্তনে ২০০১-০২ শিক্ষাবর্ষ থেকে ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে স্নাতকে সর্বোচ্চ ফলাফলধারী ১২ শিক্ষার্থী ও স্নাতকোত্তরে ৮ শিক্ষার্থীকে রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদক প্রদান করা হয় এবং অনুষদে প্রথম হওয়া মোট ৮৯ জন শিক্ষার্থীকে ‘ভাইস চ্যান্সেলর’ অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। এছাড়া ২০১৮ সালে প্রকাশিত ফলাফলের ভিত্তিতে নিজ নিজ অনুষদে শীর্ষস্থান অজর্নকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ শিক্ষার্থীকে ‘প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক-২০১৮’ এর জন্য মনোনীত করা হয়। দেশের ৩৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদে ১ম স্থান অর্জনকারী ১৭২ জন শিক্ষার্থীকে এ পদকের জন্য মনোনীত করা হয়। ১৯৯১ সালে একাডেমিক কার্যক্রম শুরুর পর এটি ছিলেঅ তৃতীয় সমাবর্তন। এর আগে ১৯৯৮ সালের ২৯ এপ্রিল বিশবিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন এবং এর নয় বছর পর ২০০৭ সালের ৬ ডিসেম্বর দ্বিতীয় সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়।


‘শ্রেষ্ঠ ডিজিটাল ক্যাম্পাস অ্যাওয়ার্ড’ লাভ : তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার ও প্রয়োগের স্বীকৃতিস্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটকে পিছনে ফেলে শ্রেষ্ঠ ডিজিটাল ক্যাম্পাস অ্যাওয়ার্ড লাভ করে শাবি। বিদায়ী বছরের ১০ জানুয়ারি এ তথ্য নিশ্চিত করেন উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল ক্লাস এটেনডেন্স সিস্টেম, কম্পিউটার কোর্সকে সবার জন্য বাধ্যতামূলক করা এবং কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য বায়োমেট্রিক উপস্থিতি সিস্টেম চালু, রোবট ‘লি’ ও ‘রোবো’ তৈরীর জন্য শাবিকে এ অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয় বলে জানান উপাচার্য । বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে এ অ্যাওয়ার্ড গ্রহণ করেন কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শহীদুর রহমান।

উপাচার্যের বিরুদ্ধে বেনামি শ্বেতপত্র : উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদসহ শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বেনামি শ্বেতপত্র বিতরণের সময় শ্বেতপত্র প্রণয়নে জড়িত থাকার অভিযোগে ৩ জনকে আটক করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। আটকের পর তাদের পুলিশে সোপর্দ করে প্রশাসন। ২০২০ সালের ২২ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন শিক্ষক-কর্মকর্তাদের কাছে শ্বেতপত্র বিতরণকালে তাদের আটক করা হয়। বেনামে প্রকাশিত এই শ্বেতপত্রে উপাচার্যের বিরুদ্ধে বিগত সময়ের বিভিন্ন অপকর্ম ও দুর্নীতি তুলে ধরা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। প্রকাশকদের পরিচয়ে উল্লেখ করা হয়, ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার শিক্ষক-কর্মকর্তাবৃন্দ’। এর আগের বছর সেপ্টেম্বরে উপাচার্যের বিরুদ্ধে বেনামী একটি শ্বেতপত্র প্রকাশিত হয়। এতে আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়ম, স্বৈরাচারী আচরণ, রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়সহ ৫৩টি অভিযোগ তুলে ধরা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন ক্লাস ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন : করোনাভাইরাসের কারণে ২০২০ সালের ১৮ মার্চ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায় বিশ্ববিদ্যালয়। এতে সেশনজটের শঙ্কায় পড়েন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ৩১ মার্চ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে অনলাইন ক্লাস শুরু হয়। এরপর করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের এই সংকটের সময় বিভিন্ন সমস্যা দেখিয়ে গত ৭ মে’র পর থেকে সকল ব্যাচের শিক্ষার্থীরা ভিন্ন ভিন্ন সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে অনলাইন ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়কে সেশনজট মুক্ত এবং শিক্ষার্থীদেরকে পড়াশোনামুখী রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নির্দেশনা অনুযায়ী অনলাইন ক্লাস চালু রাখার কথা জানায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু শুরু থেকেই বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়ে অনলাইন ক্লাস চালু না রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানায় শিক্ষার্থীরা। পরে বিভিন্ন অসুবিধার কারণে ব্যাচের বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর মতামতের ভিত্তিতে তারা অনলাইন ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন শর্ত দিয়ে ক্লাসে ফিরতে রাজি হন শিক্ষার্থীরা।

করোনা পরীক্ষায় ল্যাব স্থাপন : ২০২০ সালের ১৮ মে নিজস্ব অর্থায়নে বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ কোটি ১০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে করোনা ভাইরাস শনাক্তের জন্য অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি উদ্বোধন করা হয়। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন, এমপি এ ল্যাবরেটরি উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন শাবি উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগে (জিইবি) এ ল্যাব চালু করা হয়। এতে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১৮৮টি নমুনা পরীক্ষা করা যায়।

করোনাকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের সহায়তা : করোনা মহামারিতেও থেমে ছিলো না বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম। চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড। শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাসে উপস্থিতি নিশ্চিতের লক্ষ্যে নেয়া হয় বিভিন্ন ব্যবস্থাও। করোনা মহামারীর শুরু দিকে অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীদেরকে সহায়তা হিসেবে মোবাইল ব্যাংকিং এর সাহায্যে প্রত্যেককে ৩ হাজার টাকা করে প্রদান করা হয়। তাছাড়া বন্যায় আক্রান্ত জেলাসমূহের শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। এছাড়াও অনলাইন ক্লাসে সবার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে প্রতিমাসে ২ হাজারের অধিক শিক্ষার্থীর প্রত্যেককে ১৫ জিবি করে ডাটা প্রদান করা হয়। করোনায় শিক্ষা ব্যবস্থা সচল রাখতে ডিভাইস ক্রয় বাবদ সুদবিহীন ঋণ পাচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭০৩ শিক্ষার্থী। গত ২৩ নভেম্বর বিষয়টি নিশ্চিত করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ।

হল খোলা, ফি মওকুফসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন : ফাইনাল পরীক্ষার আগে আবাসিক হল খুলে দেওয়াসহ পাঁচ দফা দাবিতে ক্যাম্পাসে মশাল মিছিলসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের (সম্যক ব্যাচ) শিক্ষার্থীরা। এছাড়াও বিভিন্ন দাবি জানিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেয় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, শাখা ছাত্রলীগ ও বিভিন্ন বিভাগ ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ। পরবর্তীতে গত ২১ ডিসেম্বর পরীক্ষা শুরুর কমপক্ষে ১৫ দিন পূর্বে মেয়েদের আবাসিক হল খুলে দেওয়ার দাবিতে উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি দেয় আবাসিক হলের আড়াই শতাধিক ছাত্রী।

সম্পূর্ণ দৃশ্যমান শাবির সীমানা প্রাচীর : অবশেষে সম্পূর্ণ দৃশ্যমান হয়েছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুল প্রতীক্ষিত সীমানা প্রাচীর। বছরের শেষ দিন ৩১ ডিসেম্বর ৬ কিলোমিটার র্দীঘ এই সীমানা প্রাচীরের কাজ শেষ হয় বলে নিশ্চিত করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ।