গ্যাসের স্বপ্ন শেষ

সাঈদ চৌধুরী টিপু :: সারা দেশে যে গ্যাসের যোগান তার অর্ধেকেরও বেশি সরবরাহ হয় সিলেট থেকে। সিলেটের মাটির নীচে লুকিয়ে থাকা এ সম্পদে চলছে দেশের ঘর-গেরস্থালির কাজ, শিল্পের চাকাও সচল রাখছে এ গ্যাস। সারা দেশে গ্যাসের অন্যতম যোগানদার হলেও সিলেটের ঘরে ঘরে কিন্তু এখনও গ্যাস পৌঁছেনি। আর কোনোদিন পৌঁছবেও না। অগ্রিম টাকা দিয়ে সংযোগের অপেক্ষায় যারা ছিলেন তারাও আর গ্যাস পাবেন না। শেষ হয়ে গেছে আবাসিক গ্রাহকদের পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস পাওয়ার স্বপ্ন। এখন সিলিন্ডারই তাদের স্থায়ী সমাধান। গ্যাসের আশায় আর ঝুলিয়ে না রেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে সরকার। আবাসিকে নতুন করে কাউকেই আর গ্যাস সংযোগ দেওয়া হবে না। এমনকি যাদের নামে ডিমান্ড নোট ইস্যু হয়েছে বা যাদের কাছ থেকে টাকা জমা নেওয়া হয়েছে তাদের আবেদনও বাতিল করা হবে। গ্যাস নয়, ফিরিয়ে দেওয়া হবে তাদের টাকা। জানা গেছে, বৃহস্পতিবার গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোকে এ সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়ে বাস্তবায়নের আদেশ দিয়েছে সরকারের জ্বালানি বিভাগ। সিলেট অঞ্চলে সরকারে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেড।
অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা, ২০১৯ অনুযায়ী সিলেটের নয়টি গ্যাসক্ষেত্রে (হবিগঞ্জ, কৈলাশটিলা, রাশিদপুর, হরিপুর, বিয়ানীবাজার, ফেঞ্চুগঞ্জ, জালালাবাদ, মৌলভীবাজার ও বিবিয়ানা) মোট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদের পরিমাণ ১৬ হাজার ১০৮ বিলিয়ন ঘনফুট। সারাদেশে ১১০টি তেলকূপ উৎপাদনে আছে। এর মধ্যে ৬০টিই সিলেটের মাটিতে। উত্তোলনযোগ্য প্রমাণিত গ্যাসের মোট মজুদ ২৭ ট্রিলিয়ন, এর ৫৮ শতাংশ অর্থাৎ ১৬ ট্রিলিয়নের বেশি সিলেটেই। অপরদিকে, পেট্রোবাংলার সর্বশেষ প্রাক্কলন অনুযায়ী, দেশের মোট প্রায় ৩৭ হাজার বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুতের মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ২৩ হাজার বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুদ রয়েছে বৃহত্তর সিলেটেই। তাই গ্যাস নিয়ে সিলেটের মানুষের আশা একটু বেশিই ছিলো। তাদের প্রত্যাশা ছিলো একদিন সিলেটের ঘরে ঘরে গ্যাস পৌঁছে যাবে। তবে হঠাৎ ঝড় হয়ে আসে সরকারি এক নির্দেশনা। ২০১৫ সালের ৮ জুলাই এক নির্দেশনায় জালালাবাদ গ্যাসের আওতাধীন এলাকায় গ্যাস সংযোগ না দিতে বলা হয়। এরপর ২০১৫ সালের ৩ নভেম্বর থেকে সিলেট বিভাগে গ্যাস সংযোগ প্রদান বন্ধ রয়েছে। কিন্তু তখন থেকেই সবাই আশা করে আছেন আবার গ্যাস সংযোগ মিলবে। তবে ৫ বছর অপেক্ষার পর জানা গেলো আর কোনোদিনই খুলবে না বন্ধ গ্যাসের দুয়ার। সরকারের এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়বেন আবাসন কোম্পানি ও বাসা-বাড়ি ও ফ্ল্যাটের মালিকেরা। গ্যাস না পেলে জমি-ফ্ল্যাট ক্রয়-বিক্রয়ে ভাটা পড়তে পারে। বাসাবাড়িতে ভাড়াটে পাওয়াও কঠিন হবে মালিকদের জন্য।
১৯৭৮ সালের ১ জানুয়ারি সিলেটবিজয়ী সাধক পুরুষ হযরত শাহজালালের (রাহ.) মাজারে গ্যাসের শিখা প্রজ্জলনের মাধ্যমে সিলেট শহরে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্যাস সরবরাহের সূচনা হয়। তারপর ধীরে ধীরে বাড়তে বাড়তে সিলেট বিভাগে এখন গ্যাসের গ্রাহক প্রায় ১ লাখ। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিলেট বিভাগের গ্রাহকদের জন্য দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৫৮.০০৯ এমএমসিএফডি। জালালাবাদ গ্যাসের চাহিদার ৫১ ভাগ গ্যাস যোগান দেয় সিলেট গ্যাস ফিল্ডের মালিকানাধীন কূপ কৈলাশটিলা ও বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডের মালিকানাধীন হবিগঞ্জ গ্যাস কূপ। বাকি ৪৯ ভাগ আসে বিদেশি কোম্পানি শেভরনের মালিকানাধীন নবীগঞ্জের বিবিয়ানা ও সিলেট শহরতলির জালালাবাদ ফিল্ড থেকে। দেশি-বিদেশি কোম্পানির চারটি কূপ থেকে পাওয়া এ গ্যাসই ৯৬ হাজার ৯১৪টি রাইজারের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয় সিলেট বিভাগের ঘরে ঘরে। সিলেট বিভাগে গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জালালাবাদ গ্যাসের তথ্য অনুসারে, সিলেট বিভাগে গ্যাসের মোট গ্রাহক ৯৭ হাজার ৩৯ জন। এর মধ্যে আবাসিক গ্রাহক ৯৫ হাজার ৩৫০ এবং বাণিজ্যিক গ্রাহক ১ হাজার ৬৮৯ জন। এরমধ্যে সিলেট জেলাতেই অর্ধেকের বেশি গ্রাহক রয়েছেন। জেলায় আবাসিক গ্রাহক রয়েছেন ৫৯ হাজার ৬৩৩ জন এবং বাণিজ্যিক গ্রাহক রয়েছেন ৯৮৩ জন। আবার এ গ্রাহকের বেশির ভাগই মেট্রোপলিটন এলাকার বাসিন্দা। মেট্রোপলিটন এলাকায় আবাসিক গ্রাহক রয়েছেন ৪৪ হাজার ৭৯১ জন এবং বাণিজ্যিক গ্রাহক ৮৫৪ জন। বিভাগের মধ্যে গ্রাহক সংখ্যার দিক দিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা মৌলভীবাজার জেলায় ১৬ হাজার ৮৫৬ জন আবাসিক গ্রাহক এবং ৪২৯ জন বাণিজ্যিক গ্রাহক রয়েছেন। গ্রাহক সংখ্যায় তৃতীয় অবস্থানে থাকা হবিগঞ্জ জেলায় আবাসিক গ্রাহক রয়েছেন ১২ হাজার ৪৭৪ জন এবং বাণিজ্যিক গ্রাহক রয়েছেন ১৯৪ জন। গ্রাহক সংখ্যায় সিলেট বিভাগে সবার নীচে থাকা সুনামগঞ্জে আবাসিক গ্রাহক রয়েছেন ৬ হাজার ৩৮৭ জন এবং বাণিজ্যিক গ্রাহক রয়েছেন ৮৩ জন।
কথা হয় জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক (রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) লিটন নন্দীর সাথে। তিনি বললেন, গ্যাসের নতুন সংযোগ স্থায়ীভাবে বন্ধের- এমন কোনো নির্দেশনার ব্যাপারে তার কিছু জানা নেই। তিনি বলেন, নির্দেশনা পেলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।