বাংলাদেশ পুলিশের ডিজিটাল যত সেবা

জেদান আল মুসা :: ১২ ডিসেম্বর ২০২০, ডিজিটাল বাংলাদেশ দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ছিলো ‘যদিও মানছি দূরত্ব, তবুও আছি সংযুক্ত’। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ পুলিশ গণমুখী পুলিশিং সেবা নিশ্চিতে অনেকগুলো ডিজিটাল সেবা প্রদান করছে। ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে পুলিশের সেবা প্রদান অনেকটাই সহজ হয়েছে এবং সেটি জনসাধারণের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাচ্ছে অতি দ্রুত।
বাংলাদেশ পুলিশ যে সমস্ত ডিজিটাল সেবা প্রদান করছে সেগুলো হলো- জাতীয় জরুরি সেবা-৯৯৯, ডিজিটাল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, পুলিশ সদরদপ্তরের আইজিপি কমপ্লেইন সেল, অনলাইন পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট, ই-ট্রাফিক প্রসিকিউশান অ্যান্ড ফাইন পেমেন্ট সিস্টেম, পয়েন্ট অব সার্ভিস (পস), বিডি পুলিশ হেল্প লাইন, পুলিশের ফেসবুক পেজ, বাংলাদেশ পুলিশ ইউটিউব চ্যানেল, উন্নত অফিসিয়াল ওয়েবসাইট, সিটিজেন ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, হ্যালো সিটি, ক্রাইম ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, ভিডিও কনফারেন্স সিস্টেম। এসব ডিজিটাল সেবার মধ্যে অন্যতম পুলিশিং সেবা হলো অনলাইন পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট।
২০১৭ সালের শুরুতে অনলাইন পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট চালু করা হয়। যার মাধ্যমে ভোগান্তি ছাড়াই গড়ে ০৭/১০ কার্যদিবসের মধ্যে সাধারণ মানুষ ঘরে বসেই পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে পারছেন। এই সার্টিফিকেটে থাকছে কিউআর কোড। যা স্ক্যান করে সরাসরি পুলিশের ওয়েবসাইট থেকে ইস্যু হওয়া সার্টিফিকেটের ডিজিটাল কপি দেখা যাবে। যার ফলে বিদেশি দূতাবাস/ মিশনগুলো অনলাইনে খুব সহজেই পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট যাচাই করতে পারছে।
আইজিপি কমপ্লেইন সেলের মাধ্যমে পুলিশ সদস্যের যেকোনো অপেশাদার ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সরাসরি, কুরিয়ার সার্ভিস, ডাকযোগে অথবা মোবাইল ফোনে অভিযোগ করা যায়। সেটাতেও যদি সম্ভব না হয় তাহলে ই-মেইলে: complain@police.gov.bd -তে অভিযোগ করতে পারবেন। যুগের চাহিদা অনুসারে পুলিশ জনগণের কাছে যেতে এইসব পথে এগুচ্ছে। ইতিমধ্যে ডিজিটালাইজেশনের সুফল আসতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের অনেক জায়গায়
পয়েন্ট অব সার্ভিস (পস)-এর মাধ্যমে অনলাইনে মোটরযান সংক্রান্ত মামলা রুজু ও জরিমানা আদায় করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে সব জেলাতে এটি চালু হবে। এছাড়া অন লাইনের মাধ্যমে পুলিশ গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ও ড্রাইভিং লাইসেন্স যাচাই-বাছাই করছে।
২০১৬ সালে চালু করা হয়েছে মোবাইল অ্যাপস ‘বিডি পুলিশ হেল্প লাইন’। এই অ্যাপস-এর মাধ্যমে যে কেউ লগইন করে অপরাধ ও অপরাধী সম্পর্কে তথ্য দেওয়া ও যেকোন ধরনের পুলিশি সেবা চাইতে পারেন। এর মাধ্যমে ওসি থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন যেকোন পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে যেকেও অপরাধ সংক্রান্ত তথ্য, কথোপকোথন, ছবি ও ভিডিও পাঠাতে পারেন। পুলিশ কর্মকর্তারা সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়ে বার্তাদাতাকে গৃহীত ব্যবস্থা সম্পর্কে অবহিত করে থাকেন।
বাংলাদেশ পুলিশের একটি ডাইনামিক ফেসবুক পেজ রয়েছে। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটেরও আলাদা আলাদা ফেসবুক পেজ রয়েছে। জনমনে পুলিশ সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা দিতেই এসব ফেসবুক পেজ খোলা হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের অফিসিয়াল ফেইসবুক পেইজ-https://www.facebook.com/BangladeshPoliceOfficialPage
‘বাংলাদেশ পুলিশ ইউটিউব চ্যানেল’ নামে রয়েছে নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল। এ চ্যানেলে পুলিশের ইতিবাচক ও উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমের ভিডিও নিয়মিত আপলোড করা হচ্ছে। বাংলাদেশ পুলিশের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেল-https://youtube.com/channel/UCiEcilZfqbetHCJe6oci6FQ।
বাংলাদেশ পুলিশের অফিসিয়াল টুইটার-https://twitter.com/d_police?lang=en।
এছাড়াও ‘আমার পুলিশ@ফোনবুক’ নামক অ্যাপস গুগল প্লে স্টোর থেকে ডাউনলোড করে যেকোন প্রয়োজনে পুলিশি সেবা গ্রহণ করা যাবে। এটিতে পাবেন সকল পুলিশ অফিস ও কর্মকর্তাদের মোবাইল, ফোন, ই-মেইল, ফ্যাক্স নম্বর।
উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশ পুলিশ বিভাগ থেকে জাতীয় জরুরি সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে ‘ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি সার্ভিস সেন্টার-৯৯৯’ কার্যক্রম চলমান। এ সেবায় পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরী মেডিকেল সেবা পাওয়া যাবে। দেশের যেকোনও প্রান্ত থেকে ল্যান্ড ও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ৯৯৯-এ ডায়াল করা যাবে। মোবাইলে টাকা নাথলেও কল করা যাবে।
অতিসম্প্রতি নারী সেবা সংক্রান্ত শুধু নারী ভিকটিমদের সহায়তার জন্য ‘Police Cyber Support for Women(PCSW)’ নামক একটি সেবা পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স এ চালু করা হয়েছে। সাইবার বুলিং, আইডি হ্যাক, স্পর্শকাতর তথ্য-ছবি-ভিডিও প্রকাশ, সাইবার স্পেসে যৌন হয়রানি ইত্যাদি অপরাধের শিকার শুধুমাত্র নারী ভিকটিমগণ ফেসবুক পেজ, ই-মেইল ও হটলাইন নম্বরের মাধ্যমে সেবা গ্রহণ করতে পারবেন।
পুলিশের জন্য ডাইনামিক ওয়েবসাইট চালু আছে। এই ওয়েবসাইটে পুলিশের সিটিজেন চার্টার, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট, এক্সপাট্রিয়েট হেল্প সেল, মিসিং ভেহিক্যাল, কমপ্লেইন্ট বাটনের মাধ্যমে যেকোনও বিষয়ে সেবা, অভিমত ও অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা রয়েছে। পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের নিয়োগ ও অন্যান্য বিজ্ঞপ্তিও ওয়েব সাইটে প্রকাশ করা হয়।
বাড়ির মালিক ও ভাড়াটেদের তথ্যাদি যথাযথভাবে সংরক্ষণের জন্য ‘সিটিজেন ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ (সিআইএমএস) চালু করা হয়েছে। সাইবার অপরাধ, বিকাশের মাধ্যমে প্রতারণা, ফেইস বুকে প্রতারণা বন্ধে কাজ করছে সিআইডি, এসবি, পিবিআই, জেলা ও মেট্রোপলিটন পুলিশ। হ্যালো সিটি এপস আপনি আপনার এলাকার জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের তথ্য পুলিশকে জানাতে পারেন। অপরাধ দমন ও অপরাধী গ্রেফতারে দেশের অনেক জায়গা সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। দূর্ঘটনা প্রতিরোধে অনেক সড়ক-মহাসড়কেও সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হচ্ছে। ভিডিও কনফারেন্স সিস্টেমের মাধ্যমে পুলিশ সদর দফতর হতে সব সময় সকল রেঞ্জ, জেলা ও মেট্রোপলিটনসহ মাঠপর্যায়ের সকল কর্মকর্তাদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধ দমন কনফারেন্সসহ বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ ও নির্দেশনা দেন বাংলাদেশ পুলিশের আইজিপি মহোদয়।
বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসোপানে অবস্থান করছে। বর্তমানে আমাদের মাথাপিছু আয় ২০৬৪ ডলার। জাতির পিতার সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্নের বাস্তবায়নে তার সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমস্ত্রী শেখ হাসিনা ভিশন-২০২১ ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে ভিশন-২০৪১ ঘোষণা করেছেন। এই অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ পুলিশও সক্রিয় অংশীদার। নিরবিচ্ছিন্ন এই উন্নয়ন টেকসই করার লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার আন্তরিকতা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সহিত নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করে আসছে। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের নামে বাংলাদেশের এই উন্নয়নের অগ্রযাত্রা কোনোভাবে ব্যাহত করা যাবেনা। আইন-শৃঙ্খলা স্বাভাবিক ও সমুন্নত রাখার পাশাপাশি জঙ্গি ও সন্ত্রাস দমনে বাংলাদেশ পুলিশ আজ সারাবিশ্বে রোল মডেল। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে বাংলাদেশ পুলিশ ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে আরও অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।
লেখক : পুলিশ সুপার, সিলেট রেঞ্জ, সিলেট।