অপূর্ব রাসনৃত্য

কামরুল হাসান, হবিগঞ্জ :: সুরের মূর্ছনায় অপলক দৃষ্টিতে দর্শকরা দেখছিলেন মনিপুরী সম্প্রদায়ের অপূর্ব রাসনৃত্য। যাহাতে ছিলো রাধাকৃষ্ণের জীবনালেখ্য। হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার ছয়শ্রী গ্রামে মণিপুরী ঐতিহ্যের বাৎসরিক প্রধান ধর্মীয় এই উৎসব। মন্ডপে সোমবার সকাল ১১টায় মঙ্গলআরতির মাধ্যমে শুরু হয় এবং মঙ্গলবার পর্যন্ত উৎসবের আমেজে শেষ হয়।
রাসলীলার ১০টি অঙ্গ- বংশীধ্বনি, সংজল্পন, রমণখেলা, অন্তর্ধান, আবির্ভূত আসনে বসন, প্রশ্ন কুটোত্তর, নৃত্যোল্লাস, কুঞ্জেরহ, বাড়িখেলা ও বনবিহরনমের মাধ্যমে রাসলীলা। রাধার পোশাক, মাথায় চূড়ার ওপর ‘ককনাম’, মুখে পাতলা সাদা কাপড়ের ঢাকনা ‘মেইকুম’, গায়ে রেশমি ব্লাউজের উপর জড়ানো সাদা লংকথ ‘থারেং’ ব্যবহার ছিল আকর্ষণীয়। ছোটখাটো বিভিন্ন সামগ্রীর ব্যবহার বিশেষ করে চন্দন, ধূতিসহ পায়ে নূপুরের ব্যবহার নৃত্যকে কমনীয়, আকৃষ্ট ও মোহাবিষ্ট করে তোলে। নান্দনিকতার আধুনিক সব ছোঁয়ায় ভরপুর ছিল কল্পিত রাধাকৃষ্ণের মহারাসলীলার নৃত্যে। কৃষ্ণের বাঁশির সুর আর গানে মোহিত রাধার নৃত্যের তাল উপভোগ করেছেন মণিপুরী নারী-পুরুষ।
প্রতিবছর কার্তিক মাসের পূর্ণিমাতিথিতে আড়ম্ভরভাবে অনুষ্ঠিত হয় মহারাসলীলা। তবে এ বছর করোনা পরিস্থিতির কারণে দুর্গোৎসব ও লগ্নের জন্য বিলম্বে এই আয়োজন করা হয়েছে।
মণিপুরী নৃত্যকলা শুধু ছয়শ্রী নয়, গোটা ভারতীয় উপমহাদেশ তথা বিশ্বের নৃত্যকলার মধ্যে একটি বিশেষ স্থান দখলে করে আছে। মহারাসলীলায় শিশু থেকে শুরু করে কিশোর-কিশোরী সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে রাতের রাসোৎসব হয়ে উঠে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। দিনে রাখাল নৃত্যের পর থেকেই সন্ধ্যায় শুরু হয় রাসলীলা। শুরুতেই পরিবেশিত হয় রাসধারীতের অপূর্ব মৃদঙ্গ নৃত্য। মৃদঙ্গ নৃত্য শেষে প্রদীপ হাতে নৃত্যের তালে তালে সাজানো মঞ্চে প্রবেশ করেন শ্রী রাধা সাজে সজ্জিত একজন নৃত্যশিল্পী বৃন্দা। তার নৃত্যের সঙ্গে বাদ্যের তালে তালে পরিবেশিত হয় মণিপুরী বন্দনা সঙ্গীত। শ্রীকৃষ্ণ রূপধারী বাঁশি হাতে মাথায় কারুকার্যখচিত ময়ূর গুচ্ছধারী এক কিশোর নৃত্যশিল্পীর বাঁশির সুর শুনে রজগোপী পরিবেশিত হয়ে শ্রী রাধা মঞ্চে আসেন। শুরু হয় সুবর্ণ কংকন পরিহিতা মণিপুরী কিশোরীদের নৃত্য প্রদর্শন। স্থানীয় শিল্পীদের এই পরিবেশনা সবাইকে বিমোহিত করে। এদিনের জন্য তারা প্রস্তুতি নেন দীর্ঘ সময় নিয়ে। শিল্পীরা বংশপরম্পরায় চর্চা করে আসছেন এই নৃত্যকলা।
উৎসবে প্রধান অতিথি ছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জহিরুল হক শাকিল।