১২৫ অবৈধ গরু বনাম ১ চোর ধরা

মেঘালয় পুলিশের স্বীকারোক্তি


বিশেষ প্রতিনিধি :: আন্তঃ সীমান্ত গরু চোরাচালান সিন্ডিকেটের উপস্থিতি বিষয়ে মেঘালয় পুলিশের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি বিস্ময় তৈরি করেছে। পুলিশ কার্যত নিজেরাই বলল, বছরে দেড় হাজারের বেশি গরু উদ্ধারের বিপরীতে তারা বছরে মাত্র ১৫ জনেরও কম ব্যক্তিকে চিহ্নিত ও অভিযুক্ত করতে পেরেছে। তার মানে প্রতি মাসে মেঘালয় অবৈধ গরু ধরে সোয়াশ, মানুষ ধরে মোটামুটি ১ জন। গত বুধবার এক বিবৃতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে তারা স্বীকার করেছে, বাংলাদেশের গরু চোরাচালানীদের সঙ্গে নিয়ে আসাম- মেঘালয় সীমান্তে একটি শক্তিশালী গরু চোরাচালান সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে।
মেঘালয়ের পুলিশের উপ প্রধান আরো বলেন, রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে সংগঠিত অপরাধ চক্র সক্রিয় রয়েছে । তারা আসামের সঙ্গে আন্তঃরাজ্য এবং বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত চোরাচালানিতে নিয়োজিত আছে । মেঘালয়ের এআইজি আরও উল্লেখ করেছেন, এই সিন্ডিকেট শুধু গরু চোরাচালান বা গরু চুরি নয়। তারা অন্যান্য চোরাচালানির সঙ্গেও জড়িত। তার কথায়, সাম্প্রতিককালে গরুচুরি বেড়েছে। বহু মানুষ তাদের বাড়ি থেকে গরু চুরির ঘটনা পুলিশকে অবহিত করছে। কিন্তু পর্যবেক্ষকরা বলছেন, যে পরিমাণ গরু চোরাচালান সীমান্ত সংলগ্ন গরুর হাটগুলো থেকে অনুমিত হয়, সেই তুলনায় মেঘালয়ের পুলিশের বিবৃতি বরং তাদের স্বচ্ছতার বিষয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
২০১৬ সাল থেকে গত ৫ বছরে সমগ্র মেঘালয়ে দায়ের করা মামলার সংখ্যা ৪৯৮। মেঘালয়ের মিডিয়া বলেছে, এই পরিসংখ্যান বিএসএফ–এর দাবি করা গরু চােরাচালানির পরিসংখ্যানের সঙ্গে মিলছে না। সেই হিসেবে এটা অনেক কম ।
সিলেটে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এতে এটা স্পষ্ট যে, গরু চোরাচালান নিয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের অবস্থান পরিষ্কার নয়। এটা মনে করা হয়ে থাকে যে, গরু ও মাদকসহ যেকোনো চোরাচালান, সেটা যখন তাদের পক্ষে যায়, তখন তারা এক ভাষায় কথা বলে, কোনো প্রতিকূল অবস্থায় তারা দায় অন্যের ঘাড়ে চাপায়। মেঘালয় পুলিশের তরফে আন্তঃদেশীয় সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব স্বীকার করাও অবশ্য একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে তারা মন্তব্য করেন।
তবে গত ৫ বছরে মাত্র ২২৯ জনকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক এবং ৭৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে । তার মানে বছরে ১৫ জন চোরাচালানীকে তারা চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু সচেতন মহল মনে করেন, ভারতীয় অংশেই গত ৫ বছরে অন্তত কয়েক শত ব্যক্তির সক্রিয়ভাবে গরুচুরি বা চোরাচালানিতে যুক্ত থাকাটা স্বাভাবিক। এই সময়ে মেঘালয় রাজ্যে ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে দুশ পাচটি মামলায়। ২২০টি মামলা এখনও তদন্তাধীন। ৫ বছরে গরু জব্দ করা হয়েছে সাড়ে ৭ হাজারের বেশি।
পুলিশের এআইজি আরো উল্লেখ করেছেন যে, সকল জেলার এএসপির কাছে মেঘালয় পুলিশের সদর দপ্তর থেকে একটি সার্কুলার জারি করা হয়েছে। যাতে তারা আন্তঃসীমান্ত পেট্রোল বাড়িয়ে দেয় । গ্রামে গ্রামে উঠান সভার আয়োজন করে। তাদের সঙ্গে কথা বলে গরুচুরি সমস্যার এবং প্রতিরোধের বিভিন্ন উপায় সম্পর্কে গ্রামবাসীদের সঙ্গে মতবিনিময় করে।
উল্লেখ্য, আসাম-মেঘালয় সীমান্তে গরু চোরাচালান একটি ওপেন–সিক্রেট বিষয়। জৈন্তাপুর- মেঘালয় সীমান্তে বিএসএফ ও বিজিবির নজরদারি এড়িয়ে গরু চোরাকারবারিদের প্রতাপ নতুন নয়। সীমান্তে কর্তব্যরত বিএসএফ ও বিজিবির এক শ্রেণীল সদস্যদের প্রত্যক্ষ–পরোক্ষ ইশারায় সীমান্ত এলাকায় রাতের আঁধারে কিংবা দিনের আলোয় চোরাকারবার চলে। তবে প্রশাসন সরাসরি তা স্বীকার করে না। মেঘালয়ের পুলিশ অবশেষে আন্ত সীমান্ত সিন্ডিকেটের উপস্থিতি উল্লেখ করলেও তারা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার যোগসাজশের বিষয়ে নিরব থেকেছে। বিবৃতিতে এবিষয়ে কোনো কথা নেই।
অবৈধ গরু চোরাকারবারির সাথে জড়িত সীমান্তের উভয়পাশের ব্যক্তিদের গ্রেফতার করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে তাই নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। করোনার আগে প্রায় প্রতিদিন জৈন্তাপুর উপজেলা সদরের পূর্ব বাজার, সিলেট-তামাবিল সড়কের পাশে অবস্থিত দরবস্ত বাজার এবং হরিপুর বাজারে অবৈধভাবে আসা ভারতীয় গরু-মহিষের বাজার এবং সেখানে প্রকাশ্য বিকিকিনির সবটাই প্রধানত চলে প্রকাশ্যে।