সিলেটের ৩ জেলায় ৫ অপমৃত্যু

স্টাফ রিপোর্ট :: সিলেট জেলা ও বিভাগের অন্যান্য জেলাসমূহের বিভিন্ন উপজেলাতে পৃথক পৃথক ঘটনায় ৫টি অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। সিলেট জেলার জৈন্তাপুরে কীটনাশক খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন এক কিশোরী। গোয়াইনঘাট উপজেলায় এক গৃহবধুর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ধারণা করা হচ্ছে তাকে তার স্বামী হত্যা করেছেন। সুনামগঞ্জ জেলার ছাতকে কুলসুমা বেগম নামে এক নারীর মরদেহ ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। কমলগঞ্জে এক কলেজছাত্রীর আত্মহত্যা করেছে। বড়লেখায় এক যুবকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

আমাদের জৈন্তাপুর প্রতিনিধি জানান, জৈন্তাপুরের তানজিনা (১৫) নামের এক কিশোরী কীটনাশক খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন। বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নিজপাট ইউনিয়নের মাঝের বিল গ্রামে এ ঘটনাটি ঘটে। নিহত তানজিনা ওই গ্রামের আব্দুর রফিকের মেয়ে।

জানা যায়, সকাল থেকে তানজিনার পিতা ও ভাইয়েরা মিলে ধান কাটার জন্য হাওরে যান। এসময় তাদের ঘরে ধানের পোকা নিধনের জন্য তৈলাক্ত একটি কীটনাশক রাখা ছিল। বাড়িতে তানজিনা অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে তার পরিবারের লোকজন সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসলে জরুরী বিভাগের চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তানজিনার পরিবারের ধারণা সে ওই কীটনাশক খেয়ে মারা যায়। হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়, তানজিনা নামের এক কিশোরী কীটনাশক খেয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে চিকিৎসকরা ধারণা করছেন। যদি সে শরীরে কীটনাশক ব্যবহার করত তাহলে তার মৃত্যু হত না।

বিষয়টি নিশ্চিত করে তানজিনার বড় ভাই কামরুল ইসলাম জানান, আমরা সকাল থেকে ধান কাটার জন্য হাওরে ছিলাম। এসময় আমাদের কাছে খবর আসে তানজিনা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বাড়িতে যাওয়ার পর সে জানায় একটি বোতলে রাখা ধানের কীটনাশককে সরিষার তেল ভেবে সে শরীরে দেয় বলে তানজিনাকে হাসপাতালে নিয়ে আসার পথে সে এ বিষয়টি আমাদেরকে জানায়। তাকে জিজ্ঞেস করার পর সে কীটনাশক খায়নি বলে আমাদেরকে জানায়। এর বাহিরে আর কিছু জানা যায়নি।

জৈন্তাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, শুনেছি আমার থানা এলাকায় এক কিশোরী বিষ খেয়ে অসুস্থ হলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর মৃত্যু হয়েছে। এর বেশি তথ্য তিনি জানাতে পারেননি।

গোয়াইনঘাট প্রতিনিধি জানান, উপজেলায় এক গৃহবধুর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহত ওই গৃহবধুর নাম রাহেনা বেগম (২২)। তিনি উপজেলার কান্দিগ্রামের কুতুব উদ্দিনের স্ত্রী। বুধবার গভীর রাতে কান্দিগ্রামে নিজ বাড়ির পার্শ্ববর্তী চলিতা গাছ থেকে তার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ঘাতক স্বামী কুতুব উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়াইনঘাট থানা পুলিশ।

নিহতের পরিবারের দাবি, স্বামী এবং ভাসুরই নির্যাতনের পর খুন করে রাহেনার লাশ গাছের সাথে ঝুলিয়ে আত্মহত্যার নাটক সাজাতে চেয়েছিলো।

২০১৬ সালে কান্দিগ্রামের মৃত কাদিরের ছেলে কুতুব উদ্দিনের সাথে একই উপজেলার কদমতলা গ্রামের রাহেনা বেগমের বিয়ে হয়। তাদের ৩ বছরের একটি মেয়ে আছে। বুধবার রাত সাড়ে ৯টায় রাহেনার বাবা শফিক মিয়াকে ফোন করেন স্বামী কুতুব উদ্দিন।

তিনি জানান, রাহেনা গাছের সাথে ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছে। তাৎক্ষণিক শফিক মিয়া বিষয়টি সালুটিকর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক মো. শফিকুর রহমান খানকে জানালে তিনি কান্দিগ্রামে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। সেখানে গিয়ে কুতুবের বাড়ির পূর্বপাশে একটি চলিতা গাছের সাথে রশি দিয়ে ফাঁস লাগানো অবস্থায় গৃহবধু রাহেনা বেগমের লাশ উদ্ধার করা হয়। আত্মহত্যার বিষয়টি এবং তার স্বামীর কথাবার্তা সন্দেহজনক মনে হওয়ায় কুতুব উদ্দিনকে নজরদারিতে রাখে পুলিশ। সুরতহাল করার পর রাহেনার লাশ ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী হাসপাতালের পাঠানো হয়।

তাৎক্ষণিক রাহেনার ভাই বাদী হয়ে গোয়াইনঘাট থানায় একটি হত্যা মামলা (নম্বর ২০) দায়ের করেন। মামলায় আসামি করা হয় রাহেনার স্বামী কুতুব উদ্দিন এবং ভাসুর মঈন উদ্দিনকে। মামলার প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার ভোর রাতে কান্দিগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মামলার প্রধান আসামি রাহেনার স্বামী কুতুব উদ্দিনকে। বৃহস্পতিবার দুপুরে তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।

সালুটিকর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ, পুলিশ পরিদর্শক মো. শফিকুর রহমান খান একাত্তরের কথাকে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, গৃহবধুর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের পর তার পরিবারের দায়ের করা মামলায় আমরা স্বামী কুতুব উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হই। পরিবারের দাবি, রাহনা বেগমকে অকথ্য নির্যাতনের পর হত্যা করে লাশ ঝুঁলিয়ে রেখেছেন তার স্বামী ও ভাসুর। স্বামীকে বৃহস্পতিবার কুতুব উদ্দিনকে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। মইন উদ্দিনকে গ্রেপ্তারে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

আমাদের ছাতক প্রতিনিধি জানান, ছাতকে কুলসুমা বেগম (৩০) নামে এক নারী বসতঘর সংলগ্ন একটি আম গাছের ডালের সাথে গলায় রশি দিয়ে ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। বৃহস্পতিবার সকালে তার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে সুনামগঞ্জ মর্গে প্রেরণ করেছে পুলিশ। কুলসুমা বেগম ছাতক সিমেন্ট কারখানার ইঞ্জিনিয়ারিং টিলার ৬ নং বাসার বাসিন্দা কারখানার সমবায় সমিতির অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলামের মেয়ে।

জানা যায়, বুধবার রাতে প্রতিদিনের মতো রাতের খাবার খেয়ে নিজ কক্ষে ঘুমিয়ে পড়েন কুলসুমা। বৃহস্পতিবার ফজরের নামাজ আদায় করে মেয়েকে নিজ কক্ষে না দেখে তাকে খুঁজতে থাকেন বাবা সিরাজুল ইসলাম। এক পর্যায়ে বসতঘর সংলগ্ন একটি আম গাছের ডালের সাথে মেয়ের ঝুলন্ত লাশ দেখে চিৎকার করতে থাকেন তিনি। খবর পেয়ে ছাতক থানার এসআই আতিক ঘটনাস্থল থেকে লাশ উদ্ধার করে সুনামগঞ্জ মর্গে প্রেরণ করেন। এ সময় পৌর কাউন্সিলর আখলাকুল আম্বিয়া সোহাগ ও সুদীপ দে উপস্থিত ছিলেন।

স্থানীয়সূত্রে জানা যায়, এমএ পাস করা কুলসুমা পরিবারের দুঃখ ঘুচাতে বিভিন্ন সরকারী দপ্তরে চাকুরীর জন্য নিয়মিত আবেদন করতেন। অবসর প্রাপ্ত পিতার পরিবারে বোঝা না হয়ে পরিবারকে সহযোগিতা করতে চাকুরীর জন্য হন্য হয়ে উঠেন তিনি। কিন্তু ভাগ্য তাকে সহায়তা না করায় এক পর্যায়ে তার সরকারি চাকুরীর বয়সসীমা পেরিয়ে যায়। এসব ঘটনায় মান-অভিমানে উচ্চ শিক্ষিত কুলসুমা বেচে নেন আত্মহত্যার পথ। এ ঘটনায় থানায় ইউডি মামলা রুজু করা হয়েছে।

কমলগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগরে শিংরাউলী গ্রামে এক কলেজছাত্রী রহস্যজনকভাবে আত্মহত্যা করেছে। বুধবার বিকাল ৩ টায় নিজ বাড়িতে বিষপান করলে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। স্থানীয়রা জানান, শিংরাউলী গ্রামের সৈয়দ কুতুব উদ্দীনের কন্যা শারমিন নাহার ডলি (২২) বুধবার বিকালে রহস্যজনক কারণে বিষপান করেন। বাড়ির লোকজন তাকে উদ্ধার করে প্রথমে কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে যাওয়ার পর সন্ধ্যায় চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। নিহত শারমিন নাহার ডলি মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের অনার্স ৩য় বর্ষের ছাত্রী।

শমশেরনগর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রায়হান ফারুক ওই কলেজ ছাত্রীর আত্মহত্যা নিশ্চিত করে বলেন, নিহত শারমিনের মরদেহ মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে বাড়িতে এনে দাফন সম্পন্ন করা হবে। কমলগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ আরিফুর রহমান বলেন, ঘটনা মৌলভীবাজারের। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে ঘটনা জানা যাবে।

আমাদের বড়লেখা প্রতিনিধি জানান, মৌলভীবাজারের বড়লেখায় নিজাম উদ্দিন (২০) নামে এক যুবকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার দুপুরে উপজেলার পূর্ব শংকরপুর গ্রামের শামছুল ইসলামের বাড়ির পাশের একটি করই গাছ থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। ময়না তদন্তের জন্য পুলিশ নিহতের লাশ মর্গে পাঠিয়েছে। এ ব্যাপারে থানায় অপমৃত্যু মামলা হয়েছে।

পুলিশ ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের কালা মিয়ার ছেলে নিজাম উদ্দিন (২০) দীর্ঘদিন ধরে বড়লেখা উপজেলার পূর্বশংকরপুর গ্রামে তার দুলাভাই শামছুল ইসলামের বাড়িতে বসবাস করছেন। বৃহস্পতিবার সকালে বাড়ির পাশের একটি করই গাছে স্থানীয় লোকজন নিজামের ঝুলন্ত লাশ দেখতে পান। খবর পেয়ে দুপুরে পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।

বড়লেখা থানার এসআই হজরত আলী জানান, সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরী করে ময়নাতদন্তের জন্য নিহত নিজাম উদ্দিনের লাশ মর্গে পাঠিয়েছেন। স্বজনরা বলেছেন তিনি মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যাই মনে হচ্ছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।