ভোটে কিবা আসে যায়

সাঈদ চৌধুরী টিপু :: মুসলিম সাহিত্য সংসদ। সাহিত্যের সেবায় পথ চলছে ৮৪ বছর ধরে। দেশবিভাগের আগে তখনকার বাংলার রাজধানী কলকাতা, আসামের রাজধানী শিলংয়েও আলো ছড়িয়েছিলো এ প্রতিষ্ঠান। ব্রিটিশের কৌশলী নীতিতে পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত করতে জন্ম নেওয়া এ প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু ছিলো ‘বাংলার রাষ্ট্রসীমা হতে নির্বাসিতা’ সিলেট। সিলেটের মূল শাখাটি তখন পরিচিতি পেয়েছিলো ‘কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ’। কালের স্রোতে বাকি শাখাগুলো হারিয়ে গেছে, স্মৃতি হয়ে শুধু সিলেটে মুসলিম সাহিত্য সংসদের সাথে কেন্দ্রীয় শব্দটি জুড়ে আছে এখনও।
স্মৃতি, আবেগ আর ঐতিহ্যের প্রতীক হয়েই সিলেট নগরীর দরগা গেইটে দৃষ্টিনন্দন ভবনে নিজের গর্বিত অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে সাহিত্যচর্চা সংগঠন কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ, যার আদুরে নাম ‘কেমুসাস’। কালের যাত্রায় আভিজাত্য পেলেও প্রাণ যেনো কোথায় হারিয়ে গেছে এ প্রতিষ্ঠানের। একটি বিশেষ আদর্শের ছায়ায় ঢাকা পড়ে গেছে প্রতিষ্ঠানটির সর্বজনীনতা। নিজেদের কর্তৃত্ব ধরে রাখতে তারা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেন। কর্তৃত্ব হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে প্রতিষ্ঠানটির কমিটি গঠনের সময় হলেই তারা মাঠে নেমে পড়েন সদলবলে। তারা তখন ভোল পাল্টান, বেশ ধরেন। তাদের চেষ্টা থাকে নির্বাচন এড়িয়ে ‘ম্যানেজের কমিটি’ তৈরির। কেমুসাসের সাম্প্রতিক ইতিহাসে ভোটাররা প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার সুযোগ তাই কমই পেয়েছেন। এবারও বোধহয় এমনটিই ঘটতে যাচ্ছে।
যে কমিটি বর্তমানে কেমুসাসের হাল ধরে আছে তার সদস্যরাও ভোট ছাড়াই দায়িত্বে এসেছেন। কমিটি জন্মের ক্ষণে ২০১৮ সালে যদিও নির্বাচনী একটি আবহ তৈরি করা হয়েছিলো। কিন্তু ভোটের আগেই ‘ম্যানেজ থিওরি’ ব্যবহার করে সমঝোতার একটি প্যানেল তৈরি করা হয়। সেবার কোনো পদেই বিকল্প প্রার্থীর সুযোগ রাখা হয়নি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন কমিটির ২৩ সদস্য। এর আগের কমিটিকে নির্বাচনী ঝামেলাও পোহাতেও হয়নি। ২০১৬ সালে একটা নির্বাচন কমিশন গঠন করা হলেও পরে সেটাকে বিলুপ্ত করে সমঝোতার ভিত্তিতে কমিটি গঠন করা হয়। সব কমিটিতেই ঘুরে ফিরে আসেন একই আদর্শের কিছু চেনা মুখ, আর বিষয়টি আড়ালের জন্য সামনে রাখা হয় কিছু ছায়ামূর্তি। প্রভাবশালী সে ছায়ার নিচে আড়াল পড়ে যায় নেপথ্যের সব কারসাজি।
এবারও তেমনই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ছায়ার জন্য ‘বটবৃক্ষ’ সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। এক প্যানেলের ব্যবস্থাও হয়েছে। জানা গেছে, একটি প্যানেল নিশ্চিতে বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিক বৈঠকও হয়েছে। অভিযোগ মিলেছে সমঝোতার বাইরে থাকা প্রার্থীদের মনোননয়নপত্র সংগ্রহ করতে দেওয়া হয়নি। নির্ধারিত সময়ের আগেই কমিশনের সদস্যরা সব কিছু গুটিয়ে নিয়ে চলে যান। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মদন মোহন কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ এম আতাউর রহমান পীর সহসভাপতি প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র সংগ্রহের জন্য প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলেন। নির্ধারিত সময়ে গিয়েও ওই প্রতিনিধি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে পারেননি বলে জানান এ শিক্ষাবিদ। তবে নির্বাচন কমিশনের প্রধান সিলেট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট নিজাম উদ্দিন এ অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, নির্ধারিত সময় পর্যন্ত তারা মনোনয়নপত্র সংগ্রহের উদ্দেশ্যে কেমুসাসেই ছিলেন। তিনি এও জানান, এ পর্যন্ত একটি প্যানেলই জমা পড়েছে। অর্থাৎ এবারও ভোট দিতে পারবেন না। তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র বাছাই শেষে ১ ডিসেম্বর বৈধ প্রার্থী ঘোষণার তারিখ ঠিক করা আছে। অর্থাৎ এদিনই ঘোষিত হতে পারে ভোটবিহীন কমিটি।
জানা গেছে, ভোট ছাড়া সমঝোতার কমিটি নিয়ে বিতর্ক এড়াতে এবারও কৌশলী ভূমিকা নেওয়া হয়েছে। সিলেটের সর্বজনমান্য ব্যক্তিত্ব সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে সভাপতি হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে জমা দেওয়া প্যানেলটিতে। নিঃসন্দেহে দেশবরেণ্য এ ব্যক্তি এ পদটির জন্য সবচেয়ে যোগ্যতম। অন্যদের মুখ বন্ধ করতে ও নিজেদের দখল টিকিয়ে রাখার জন্যই ভোটকৌশলীরা তাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে না পারা আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ আতিকুর রব চৌধুরী জুয়েল বলেন, কেমুসাসকে একটি গোষ্ঠী সব সময়ই নিজেদের কাছে কুক্ষিগত করে রাখতে চায়। তারা নিজেদের বলয়ের বাইরে নেতৃত্বকে ছড়িয়ে দিতে চায় না। নির্বাচন এলে নানা কৌশলে আগ্রহীদের সাহিত্যপ্রেমীদের দমিয়ে দেওয়া হয়। এবারও অনেককেই মনোনয়পত্র সংগ্রহ করতে দেওয়া হয়নি। আতিকুর রব চৌধুরী জানান, নিজের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হবেন।