ব্রিটিশ কোর্টে সুমাইয়ার জয়

বিশেষ প্রতিনিধি :: তার নাম সুমাইয়া। বয়স যখন ছয়, তখন তার জীবনে একটা দুঃস্বপ্ন দেখা দিয়েছিল। ৬ বছর বয়সে ধর্ষণের শিকার হন। ১৪ বছর পরে এসে ব্রিটিশ মিডিয়ার কাছে মুখ খুলেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত সুমাইয়া মিয়া।
দুজন ব্যক্তি। একজন তার সৎ বাবার চাচাতো ভাই। নাম তার জাকির হোসেন। জাকিরের বয়স তখন ৩৭। আরেকজন এমদাদুল লোকমান। তখন তার বয়স ৪৭।
লন্ডনের লুটন এলাকায় বেড়ে ওঠা সুমাইয়া, তার জীবনের সেই দুঃস্বপ্নের গল্প বলেছেন দি সান পত্রিকার সাংবাদিক ক্যান্ডিজ ফার্নান্দেজ এবং ক্লদিয়া অরাকে।
সুমাইয়ার বয়স এখন ২৩। যখন তার বয়স ছয়, তখন তিনি একদিন লক্ষ্য করেন, তার সৎ বাবা তার চাচাতো ভাইকে তাদের সঙ্গে থাকার আমন্ত্রণ জানান। এর কয়েক মাস পর থেকেই সুমাইয়া নিয়মিত ধর্ষণের শিকার হন। তার বাবা-মা যখন বাইরে থাকেন, তখন মিষ্টি খাইয়ে এবং তার সঙ্গে খেলা করার প্রলোভন দেখিয়ে তার সৎ পিতার চাচাত ভাই জাকির হোসেন তাকে ধর্ষণ করতে থাকেন। এর এক বছর পর তখন ২০০৫ সাল। তখন তার পরিবার এক আগন্তুককে তাদের অবশিষ্ট কামরাটি ভাড়া দিয়েছিল। লজিং থাকতে আসা সেই লোকটির নাম এমদাদুর লোকমান। কিছু দিন না যেতেই এই লোকমানও সুমাইয়াকে ধর্ষণ শুরু করে। এই দুই যৌন নির্যাতনকারী ধর্ষণ এবং যৌন হয়রানির দীর্ঘ ১৪ বছর পরে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মোট ৩৬ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন করেছেন।
আর্ট সাইকোথেরাপির ছাত্রী এখন সুমাইয়া। তিনি এখন সাহসিকতার সঙ্গে তার অতীত জীবনের ওই দুটো দুঃখজনক পাশবিক গল্প চলতি সপ্তাহে ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড দি সান পত্রিকার কাছে প্রকাশ করেছেন। তিনি এতটাই সাহসী যে তিনি তার একাধিক ছবি পত্রিকায় ছাপতে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমি তখন এক অবুঝ শিশু। তখন আমি শুধু একজন নয় দুজন দৈত্যের কাছে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিলাম। যদিও তারা আমাকে মানসিকভাবে সারা জীবনের জন্য একটা ভীতির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। কিন্তু আমি এখন সন্তুষ্ট এই ভেবে যে, শেষ পর্যন্ত আমি ন্যায়বিচার পেয়েছি।
সুমাইয়া বাস করতেন তার মা এবং সৎপিতা রাজা মিয়ার সঙ্গে। রাজা মিয়ার বয়স এখন ৫০। ২০০৪ সালে বাংলাদেশ থেকে তিনি তার চাচাতো ভাই জাকিরকে তাদের পরিবারের সঙ্গে থাকার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ৬ বছর বয়সী সুমাইয়া বিষয়টিকে সুনজরেই দেখেছিলন। সুমাইয়া মিয়া বলেছেন, জাকিরের তখন একটা থাকার জায়গা দরকার ছিল। যখন সে আমাদের সঙ্গে থাকতে শুরু করল, আমরা তখন একত্রে ক্যারামবোর্ড খেলেছি। ছবি এঁকেছি। প্রায় প্রতিদিনই সিনেমা দেখেছি। যেহেতু আমি তখন নিতান্তই শিশু ছিলাম, আমি তাকে আমাদের বাসায় পেয়ে খুশি ছিলাম। যখনই সে আমাদের বাসায় আসত, সে আমার জন্য মিষ্টি নিয়ে আসতো। কিন্তু এমনটি চলল দু মাসের বেশি নয়। জাকির হোসেন একদিন তার বেডরুমে সুমাইয়াকে ডাকল। সে বলেছিল বোর্ডগেম খেলবে। এইসময়ে মা তখন কাজে ছিলেন। এবং আমার সৎ পিতা নিচতলায় পড়ছিলেন।
আমি যেই ছক্কাটা তুলতে গিয়েছি, জাকির আমাকে ঝাপটে ধরে। আমি তাকে ঠেলে দূরে ফেলতে চাই। কিন্তু আমার ততটা গায়ে বল ছিল না। এরপর সে আমাকে ধর্ষণ করল। আমি চিৎকার দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমি তখন খুবই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। এই ঘটনার পরে সে আমাকে বলেছিল উদ্বিগ্ন না হতে। আমি ছিলাম বিভ্রান্ত এবং সন্ত্রস্ত।
এই ঘটনার পরের সপ্তাহের ঘটনা। জাকির হোসেন সুমাইয়ার শয়ন কক্ষের দরজায় এসে দাঁড়ালো। তার হাতে মিষ্টি। সে দ্বিতীয়বার ধর্ষণ করতে এসেছে। সে সময়ে সুমাইয়া বলেন, আমি তার কাছে জানতে চাইলাম, আমার বাবা-মা কোথায় ? এর উত্তরে সে আমাকে জানিয়েছিল, তারা বাড়িতে নেই। এর কয়েক মুহূর্ত পরে সে পুনরায় আমাকে ধর্ষণ করলো। কিন্তু এইবার আমি তাকে থামানোর জন্য চিৎকার করে কাঁদলাম। জাকির আমার মুখে থাপ্পড় মেরেছিল। বলেছিল, চিৎকার বন্ধ করো। সে হুমকি দিয়েছিল, আমি যদি এ ঘটনা কাউকে বলে দেই, তাহলে সে আমার মাকে ধর্ষণ করবে। আমি আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম। সেই ঘটনার পর থেকে জাকির হোসেন সুমাইয়ার পেছনে লেগে থাকে। সুযোগ পেলেই সে তার লালসা চরিতার্থ করে।
এরপরে সুমাইয়র জীবনে দুষ্টগ্রহ হিসেবে যুক্ত হয়, আরেক পাষণ্ড এমদাদুল লোকমানের কাহিনী। লোকমানের বয়স তখন ৪৭। ২০০৫ সালের জুলাই মাস। সুমাইয়ার বাবা-মায়ের কিছু অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন পড়েছিল। তখন তারা লন্ডন প্রবাসী লোকমানের কাছে তাদের অতিরিক্ত বেড রুম ভাড়া দেন। এ বিষয়ে তারা একটি বিজ্ঞাপন দিয়েছিল। সেই বিজ্ঞাপন সূত্রে লোকমান একদিন হাজির। সুমাইয়া স্মৃতিচারণ করেন যে, প্রথম দর্শনে আমার দিকে তাকিয়ে লোকমান হেসেছিল। আমি ভেবেছিলাম তিনি একজন সুন্দর মনের ভদ্রলোক। কিন্তু এক সপ্তাহ পরে যখন বাসায় কেউ ছিল না, এমদাদুল আমাকে তার বেডরুমে আমন্ত্রণ জানায়। সে আমার কাছে জানতে চায়, আমার পছন্দের টিভি শো। এবং রঙ কী।
আর তখনই সে আমাকে জড়িয়ে ধরে। আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে, আগের দুঃস্বপ্ন আবার ঘটতে শুরু করেছে। সে জোরপূর্বক আমাকে তার উপরে টেনে নেয়। ঠিক যেভাবে জাকির করেছিল। এরপর আমি চিৎকার করে কান্না করা বন্ধ করতে পারিনি। কিন্তু এরপর থেকে যখনই সুযোগ পায়, তখনই আমার উপরে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু তারা নিজেরা জানতো না যে, আমার সঙ্গে তারা কে কী করছে।
২৩ বছর বয়স্ক ভিকটিম স্মৃতিচারণ করেন, ২০০৬ সালে এমদাদুল যখন একদিন আমাকে যৌন নির্যাতন চালাচ্ছিল, আমি তাকে বলি, জাকির আমার সঙ্গে এটাই করেছে। কিন্তু তা শুনে তার মধ্যে কোনো ভাবান্তর হয় না। সে পাত্তা দেয় না এবং সে তার দুষ্কর্ম চালিয়ে যেতে থাকে। এরপর আমি শিগগিরই জাকিরকে একইভাবে বললাম এবং দেখলাম, সে এই বিষয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করল না। আমার জন্যে দুস্বপ্ন গভীরতর হল। তবে ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমাদের বাসায় লোকমানের লজিং জীবনের ইতি ঘটে। সে অন্যত্র চলে যায়। কিন্তু জাকির হোসেন আরো এক বছর সুমাইয়ার উপর নির্যাতন চালায়। তারা আট বছর বয়স না হওয়া পর্যন্ত এটা ঘটে। কিন্তু ইতিমধ্যে সুমাইয়ার মানসিক স্বাস্থ্যে একটা বিরাট ক্ষতি ঘটে যায়। সুমাইয়া বলেন, আমি ক্রমান্বয়ে চরমভাবে বিষন্ন হয়ে পড়ি। নিজের জীবনকে ক্ষোভ ও হতাশায় নিমজ্জিত করে দেই।
এরপর বেশ কয়েক বছর কেটে যায়। বয়স তখন তার ১৭। সময়টা ২০১৫ সালের এপ্রিল। সুমাইয়া বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্তু নিজেকে তিনি ক্ষমা করতে পারেন না। নিজেকে নিজে আঘাত করার প্রবণতা অব্যাহত থাকে। সুমাইয়া বলেন, সময়ের ধারায় আমি আমার স্বামীর প্রেমে পরেছিলাম এবং বিয়ে করেছিলাম। কিন্তু যৌন নির্যাতনের ভয়াল স্মৃতি আমাকে তাড়িয়ে বেড়াতে থাকে। এবং আমার বিষণ্নতা ধীরে ধীরে আরো খারাপের দিকে যেতে থাকে। তারপর একদিন আমার স্বামী যখন কাজে, তখন আমার পাকস্থলীতে আমি ছুরিকাঘাত করি। কিন্তু ভাগ্যের জোরে আমি বেঁচে যাই। এরপর আমার স্বামী এবং আমার মা হাত জোড় করে আমার কাছে এই নিবেদন রাখেন যে, আমি কেন নিজেকে শেষ করে দিতে চাইলাম। শেষ পর্যন্ত আমি তাদের কাছে সব ঘটনা খুলে বললাম।
জাকির এবং এমদাদুল আমার সঙ্গে কী করেছে, বলে দিলাম। তারা সব শুনেন। তাদের হৃদয় ভেঙে গেল। তবে সুমাইয়ার স্বামী হিরো। তিনি এগিয়ে আসেন এবং স্ত্রীকে সাহস যোগান। আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেন। তাকে বলেন, এই বিষয়ে জাকির হোসেন এবং লোকমানের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে রিপোর্ট করতে হবে। এবং সেটাই তারা করেন। এবং শিগগিরই তাদের দুজনকে খুঁজে বের করা হয়। পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে।
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি। জাকির হোসেন বাস করতেন বারগেস হিলে। লোকমান থাকতেন হাস্টিংসে। ১৩ বছরের বয়সের নিচের কিশোরীকে ধর্ষণ এবং যৌন কর্মে সম্পৃক্ত করার দায়ে উভয়ে দোষী সাব্যস্ত হন। সেন্ট অ্যালবানস ক্রাউন কোর্ট রায় দেন।