রিস্কে আছেন অধ্যাপক জাকির

স্টাফ রিপোর্ট :: আর দশ দিন পেরোলেই সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ১ বছর পূর্ণ হবে জাকির হোসেনের। তবে এক বছরে সাফল্যের ঝুড়িতে তিনি বলতে গেলে কিছুই পুরতে পারেননি। উল্টো বিতর্ক-আর সমালোচনার জন্ম দিয়ে নিজেকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছেন। কেন্দ্রের বেঁধে দেওয়া সময়ে তা স্বাক্ষরে যে কমিটি জমা হয়েছে- প্রশ্নের মুখে পড়েছে সেটা। একে কেন্দ্র করে জন্মের দেড় যুগ পর এই প্রথম মহানগরে ভাঙনের রেখা স্পষ্ট হয়েছে। এ সুরে কেন্দ্র যে সন্তুষ্ট নয় তাও স্পষ্ট। কমিটি জমা দেওয়ার পর শীর্ষ নেতাদের ঢাকায়ও ডেকে নেওয়া হয়েছে।
তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় নেতাদের মধ্যে ঐক্যের অভাব হাইকমান্ডকে ভাবিয়ে তুলেছে। দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ফেরাতে ইতোমধ্যেই কেন্দ্র কঠোর নীতি অবলম্বন করেছে। নিজস্ব বলয় বা গ্রুপিং তৈরি করা, কোন্দল অব্যাহত রাখা, দলের হাইকমান্ডের নির্দেশ অমান্যকারী এবং দায়িত্বে অবহেলাসহ শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ পেলেই তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে দলটি। এক সপ্তাহের মধ্যে দুই জেলার (সিরাজগঞ্জ ও নরসিংদী) চারজন শীর্ষ নেতাকে তাদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। সিলেটেও এমনটি ঘটবে না তা নিশ্চয়তা নেই।
কমিটিকে কেন্দ্র করে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগেও একই রকম অনৈক্যের সুর শোনা গেছে। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ মহানগর ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে। তা বিরুদ্ধে অভিযোগ, কোনো যোগ্যতা ছাড়াই প্রস্তাবিত কমিটিতে শুধুমাত্র অধ্যাপক জাকিরের পছন্দে অনেকেরই জায়গা হয়েছে। অথচ বাদ পড়েছেন ত্যাগী ও সক্রিয় অনেক নেতাই। তবে জাকির হোসেনের বাসার গৃহশিক্ষক, খালাতো ভাইসহ তা ঘনিষ্ঠ অনেকেরই জায়গা হয়েছে কমিটিতে। তাদের কারোরই দলে তেমন পরিচিতি নেই। ভালো পরিচয় তাদের শুধু জাকির হোসেনের সাথে। কেন্দ্র পর্যন্তও গেছে এ সকল অভিযোগ।
জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগের সূত্র ধরে আলোচনায় আসছে পেছনের নানা গল্প। দলীয় আদর্শের প্রতি তা উদাসীনতা, পদ আঁকড়ে থাকার মানসিকতা-আলোচনায় আসছে সব কিছুই। জাকির হোসেন আওয়ামী লীগ নেতা হলেও শিক্ষক হিসেবেও তা পরিচয় আছে। ‘অধ্যাপক’ বিশেষণে নামের আগেও জুড়েছে এ পরিচয়। তিনি সিলেট শহরতলির শাহ খুররম ডিগ্রি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হিসেবে পরিচিত হলেও বঙ্গবন্ধুর প্রতি সম্মান না জানানোয় কলেজ কর্তৃপক্ষ তাকে শোকজও করেছিলো। ২০১৭ সালের ১৫ আগস্ট কলেজের শোক দিবসের অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত থাকেননি। পদ আঁকড়ে থাকার নজিরও তিনি দেখিয়েছেন এই কলেজেই। ম্যানেজিং কমিটি সভা করে তাকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের পদ থেকে অব্যাহতি দেয়। তবে তিনি অনেকদিনই সে পদ জোর করে দখলে রাখেন। থানায় এ বিষয়ে জিডিও হয়। এ ঘটনা ২০১৮ সালের।
জাকির হোসেনকে অনেকেই বলছেন ‘বাইচান্স সেক্রেটারি’। তাদের ভাষ্য দলের প্রতি নিবেদিত না হলেও ঘটনাচক্রে তিনি সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছেন। গেলো বছরের ৫ নভেম্বর সিলেটে আওয়ামী লীগের সম্মেলনে হঠাৎই তা নাম ভেসে আসে মহানগরের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে- আগের রাত পর্যন্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শর্ট লিস্টে অধ্যাপক জাকিরের নাম ছিলো না। ওই সূত্র বলছে, মহানগরের সর্বশেষ কমিটির সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিনকে সভাপতি ও সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেলকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি ঘোষণারই প্রস্তুতি ছিলো। শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় দুটো নামই পাল্টে যায়। সভাপতি হিসেবে আসেন আসাদ উদ্দিনের বড় ভাই জেলা আওয়ামী লীগের সর্বশেষ কমিটির সহ সভাপতি মাসুক উদ্দিন আর সাধারণ সম্পাদকের পদে আসেন সর্বশেষ কমিটির যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন। একাধিক সূত্র বলছে ‘অল্পবয়সী’ ট্যাগ দিয়ে নাদেলকে সরানো হয় সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে। তবে শেষমেষ নাদেলই কিন্তু কিস্তিমাত করেন। উঠে আসেন সকলের মাথার উপরে। জায়গা পান কেন্দ্রীয় কমিটিতে সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে। নাদেল ক্যারিশমা দেখাতে পারলেও জাকির ব্যর্থ হয়েছেন ক্যারিশমা দেখাতে-বরং তিনি উসকে দিয়েছেন বিরোধের আগুন।
জাকির হোসেনর বিরুদ্ধে ক্ষোভ আছে আরও। করোনাকালে তা কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি। তা কার্যক্রম শুধু সীমাবদ্ধ ছিলো ফেসবুকের পাতাতেই। নেতাকর্মীরা কোনো সহযোগিতা পাননি তা কাছ থেকে। তা অসহযোগী মনোভাবের পরিচয় পেয়েছেন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন শফিকও। একটি সূত্র জানা গেছে, সাম্প্রতিক সিলেট সফরের সময় সাখাওয়াত শফিক কমিটি নিয়ে নানা অভিযোগের প্রেক্ষিতে অধ্যাপক জাকিরের বক্তব্য জানতে চেয়েছিলেন। তিনি জবাব দেন, ব্যস্ত আছেন পরে এ নিয়ে কথা বলবেন। বোধহয় ‘ব্যস্ততা’র কারণেই সাখাওয়াত শফিকের সিলেট ত্যাগের সময় বিদায়ও জানাতে পারেননি অধ্যাপক জাকির।