নৃশংসভাবে গৃহবধূ হত্যা : ৫৩ দিনের সংসার

স্টাফ রিপোর্ট :: গেলো সেপ্টেম্বর মাসে ধুমধাম করে সিলেটের গোলাপগঞ্জে একটি কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ে হয়েছিলো মো. আল মামুন (৩০) ও সৈয়দা তামান্না বেগমের (১৯)। গোলাপগঞ্জের খান কমপ্লেক্স থেকে মামুন-তামান্নার যুগল জীবনের শুরু আর ইতি ঘটলো রোববার দিনগত রাতে নগরীর উত্তর কাজীটুলায় নিজেদের ফ্ল্যাটে।

সোমবার সকালে অন্তরঙ্গ ৪/১ এর দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাটে শোয়ার রুমে পাওয়া গেছে সৈয়দা তামান্না বেগমের নিথর দেহ। তাকে গলায় ফাঁস লাগিয়ে খুন করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা। গলায় রক্ত জমাট বাধা ছিল। ওড়না দিয়ে ফাঁস দিয়ে বা হাত দিয়ে চেপে তাকে খুন করা হয়ে থাকতে পারে। শরীরের আরও কিছু ু অংশে ফোলা জখম রয়েছে। ঘটনার রাত থেকেই আল মামুনের খোঁজ মিলছে না। সকালে ফ্ল্যাটের দরজা বাইরে থেকে তালা দেয়া ছিল। সকালবেলা তালা ভেঙে মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

তরুণী গৃহবধূ তামান্নার পৈতৃক নিবাস দক্ষিণ সুরমা উপজেলার লালাবাজারের ফুলদি গ্রামে। তার পিতা সৈয়দ ফয়জুর হোসেন। তিনি সাবেক মেম্বার। তবে তামান্নার মা-বাবা ও পরিবারের সদস্যরা বর্তমানে গোলাপগঞ্জ পৌর এলাকার এমসি একাডেমি সংলগ্ন একটি বাসায় ভাড়া থাকেন।

আর মামুনের বাড়ি বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার চরহোগলা এলাকায়। তিনি আবুল কাশেম সরদারের ছেলে। জাতীয় পরিচয় পত্রে তার বর্তমান ঠিকানা সিলেট নগরীর বারুতখানা উল্লেখ করা রয়েছে। মামুন নগরীর জিন্দাবাজারের আল মারজান শপিং সেন্টারে ঐশী ফেব্রিক্স নামে একটি কাপড়ের দোকান পরিচালনা করতেন।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর গোলাপগঞ্জের খান সেন্টারে পারিবারিক আয়োজনেই বিয়ে হয়েছিলো মামুন-তামান্নার। স্থানীয় শাহনাজ পারভিন নামের এক নারীর মধ্যস্থতায় বিয়ে হয় দু’জনের। বিয়েতে তামান্নার পরিবারের কিছু কিছু সদস্যদের মতামত ছিলো না; ছেলের বাড়ি অন্য জেলাতে হওয়ায়। বিয়ের ঠিক আগেরদিন ২৯ সেপ্টেম্বরই উত্তর কাজীটুলার ভাড়া ফ্ল্যাটে মালপত্র তুলেন মামুন। পরের দিন নবদম্পতি বাসায় এসে ওঠেন। সেই থেকে তারা সেখানে বসবাস করছিলেন। ফ্ল্যাটে স্বামী-স্ত্রী দু’জনই থাকতেন শুধু। আর কেউ ছিলো না।

২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ২৩ নভেম্বর পর্যন্ত হিসেব করলে দুই মাসও পেরোয়নি মামুন-তামান্নার সংসারের। তার আগেই জীবন প্রদীপ নিভে গেলো তামান্নার।

অন্তরঙ্গ ৪/১ এর আশেপাশের বিভিন্ন বাসার বাসিন্দা জানান, এই ৫৩ দিনে তাদের মধ্যে একদিন খুব ঝগড়া হয়েছিলো। পরে দুই পক্ষের আত্মীয়-স্বজন বিষয়টি মধ্যস্থতা করে দেন। তার পর থেকে তাদের ভালোই কাটছিলো।

তামান্নার খালাতো ভাই মো. ইকবাল জানান, মামুন এর আগেও একটি বিয়ে করেছিলো। প্রথম বিয়ের কথা গোপন রেখে সে তামান্নাকে বিয়ে করে। প্রথম স্ত্রীর ঘরে তার একটি সন্তানও রয়েছে। মেঘনা লাইফ ইন্সুরেন্সের শাহনাজ পারভিন নামের এক মহিলা কর্মকর্তা তাকে চাচাতো ভাই পরিচয় দেন এবং তামান্নার পরিবারকে ভুল বুঝিয়ে বিয়ের আয়োজন করতে তাগদা দেন। তামান্নার স্বজনদের বেশিরভাগেরই এ বিয়েতে আপত্তি ছিল। কিন্তু শাহনাজ পারভিনের অতিউৎসাহী আচরণের কারণে তারা মেয়েকে বিয়ে দিতে বাধ্য হন। পারভীন নানা চল-চাতুরির আশ্রয় নিয়েছেন বিয়ে আয়োজনে।

তামান্নার খালাতো ভাই মো. ইকবাল হোসেন আরও বলেন, বিয়ের সময় শাহনাজ পারভিন মামুনকে আর্থিকভাবেও সহায়তা করেছেন। তার আচরণ ছিলো রহস্যময়। মামুনের বিরুদ্ধে তার আগের স্ত্রীর দায়ের করা একটি মামলাও রয়েছে।

এদিকে এ ঘটনায় এ রিপোর্ট লেখা কোতোয়ালি থানায় তামান্নার ভাই মাইক্রোবাস চালক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন রাজা বাদি হয়ে হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

কোতোয়ালি থানার ওসি মো. সেলিম মিঞা একাত্তরের কথাকে বলেন, বিকেল ৪টার দিকে মরদেহ উদ্ধার করে মরদেহ মর্গে পাঠানো হয়েছে। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট হাতে পেলে আরও জানা যাবে। নিহতের ভাই বাদি হয়ে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে আমরা মনে করছি এই মহিলাকে তার স্বামীই খুন করে পালিয়েছে। আমরা বিষয়টি তদন্ত অনুসন্ধান চালাচ্ছি।

মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) আশরাফ উল্লাহ তাহের বলেন, নবদম্পতির ফ্ল্যাটের দরজা তালাবদ্ধ দেখে বাড়িওয়ালা ও প্রতিবেশিদের সন্দেহ হয়। পরে তারা পুলিশকে খবর দেন। পরে বেলা ১১টার দিকে পুলিশ ওই বাসাতে যায়। গিয়ে ঘরের তালা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে শোয়ার কক্ষে লাশ দেখতে পায়। ঘটনায় হত্যামামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলমান রয়েছে।

১৭ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর রাশেদ আহমদ বলেন, বাড়িওয়ালা সকালে আমাকে জানান ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ। ও বাইরে থেকে তালা দেয়া। এতে তাদের সন্দেহ হয়। পরে আমি গিয়ে পুলিশকে বিষয়টি অবগত করি। পুলিশ আসলে ঘরের দরজা ভেঙে নারীর লাশটি পাওয়া যায়। এরকম ঘটনা এর আগে ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের কোনো এলাকাতেই ঘটেনি। এমন ঘটনায় আমিসহ গোটা ওয়ার্ডবাসী হতবাক। আমরা জড়িত ব্যক্তির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।