কড়া নাড়ছে ‘সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’


মিসবাহ উদ্দীন আহমদ :: সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। শহর থেকে সিলেটের মহানগরে রূপ পাওয়ার পর থেকেই যে নামটি বারবার জোরেসোরে আলোচনায় এসেছে। কিন্তু নানাকারণে প্রতিবারই উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বাস্তবে ধরা দেয়নি। তবে এবার বোধহয় জট খুলছে। সম্প্রতি সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে ঘিরেই রাজধানীর বুকে হয়েছে এক মতবিনিময় সভা। সেখানে আশার কথা জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ড. এ কে এ মোমেন। খসড়া ‘সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২০’ বিষয়ে সিলেট অঞ্চলের নেতবৃন্দের এ মতবিনিময় হয়। ওই সভাতে আরেক দফা জ্বালানি পেলো ‘সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’র চলমান ট্রেন। সভা থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে বলা চলে আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে ‘সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’।
যদি সত্যি সত্যিই সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বাস্তবায়ন হয় তবে সেটি হবে দেশের সপ্তম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রয়েছে। ষষ্ঠতম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা হচ্ছে গাজীপুরে। এটির কাজ বেশ এগিয়েছে। এছাড়া পায়রা কুয়াকাটা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারে
বিভিন্ন সময়ে সরকারের পালাবদলে মন্ত্রীত্বের স্বাদ পান সিলেটের বহু নেতা। তাদের সময়ে বহুবার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের কথা মুখে বলেছেন। কিন্তু সেটিকে বাস্তবে রূপ দিতে কেউই দৃশ্যমান উদ্যোগ নেননি। অদৃশ্য কারণে বারবারই লাল ফিতেয় বন্দি থেকে গেছে আলোচিত সেই উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। পরবর্তীতে সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ কামনা করা হয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের। তারও আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে ২০০৮ সালে সিলেট সার্কিট হাউজে উপদেষ্টা পরিষদের এক সভায় ‘সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ গঠনে সিদ্ধান্ত নীতিগতভাবে অনুমোদন পেয়েছিলো। পরবর্তীতে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন প্রণয়ন না হওয়ায় সেটি আর এগুয়নি। ফলে একযুগ পিছিয়ে পড়ে সিলেট নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের কর্মতৎপরতা।
আর নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ না থাকায় সিলেট নগরীর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চলছে এলোমেলোভাবে, অপরিকল্পিতভাবে। নগর উন্নয়নের প্রস্তাবিত মহাপরিকল্পনার ফাইল নানা ছুঁতোয় সূতোয় বন্দি।
২০০১ সালে সিলেট পৌরসভা সিলেট সিটি কর্পোরেশন উন্নীত হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন মহল থেকে দাবি ওঠে, নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের। একই সঙ্গে নগরীর উন্নয়নে একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণেরও দাবি ওঠে। যদিও আজ পর্যন্তও তা বাস্তবায়ন হয়নি। দেশের অন্যান্য দ্রুত বর্ধনশীল নগরগুলোতে পৃথক নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ থাকলেও সিলেটে সেটি ধরা দিতে দিতেও আজও ধরা দেয়নি।
বিভিন্ন সূত্রগুলোর সাথে কথা বলে জানা গেছে, সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের আপত্তি এবং স্থানীয় প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের কারণে নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের কাজ দীর্ঘসূত্রিতায় পড়েছে। কেননা নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কারণে নগর ভবনের জনপ্রতিনিধিরা অনেক ক্ষমতাই হারাবেন। সেজন্য তারা এতে খুব একটা মনোযোগী নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে সিলেট মহানগরী রয়েছে চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। সিলেটের মতো একটি দ্রুতবর্ধনশীল ও ভূমিকম্পের জন্য ডেঞ্জার জোন হিসেবে চিহ্নিত নগরে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন ও মহাপরিকল্পনা তৈরি সময়েরই দাবি। এটি আরও আগে বাস্তবায়ন করা জরুরি ছিল। যতো দেরি হবে ততোই সিলেটের ক্ষতি হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ তথ্য কর্মকর্তা মো. তৌহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, খসড়া ‘সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২০’ বিষয়ে সিলেট অঞ্চলের নেতৃবৃন্দের সাথে ১৮ নভেম্বর ঢাকায় ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভাতে খসড়া আইনের বিষয়ে নতুন কোনো পরামর্শ থাকলে তা পরবর্তী ১০ দিনের মধ্যে অর্থাৎ ২৮ নভেম্বরের মধ্যে লিখিত আকারে জানানোর জন্য অনুরোধ করা হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রেরিত প্রেসরিলিজে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ. কে. আব্দুল মোমেনের বরাত দিয়ে জানানো হয়, ‘সিলেট মহানগরের পরিধি বাড়ানোর কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং বেশ অগ্রসর হয়েছে। নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠিত হলে পরিকল্পিতভাবে কাঙিক্ষত উন্নয়ন হবে। সে কারণে এ আইন প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরি। সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইনের খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে।’ মুজিববর্ষে এ আইন প্রণয়ন করা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এ বিষয়টি ত্বরান্বিত করতে সকলের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। সভায় জানানো হয়, সিলেট মহানগরীকে একটি আধুনিক ও আকর্ষণীয় পর্যটন নগরী হিসেবে প্রতিষ্ঠা এবং এ অঞ্চলের সুপরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার জন্য আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ ওই মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন এ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার।
সভায় উপস্থিত সিলেটের প্রতিনিধিরা দাবি জানিয়েছেন, চলমান মুজিব শতবর্ষেই যেনো সিলেটবাসীর প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখে। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদও এ বিষয়ে ইতিবাচক বলে জানা গেছে। বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০১১ সালে সিলেটসহ আরো ৩টি জেলায় উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনে সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়টি জানায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। পরিকল্পিত আধুনিক নগর গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই উদ্যোগ নেয় সরকার। কিন্তু সে সময়েও আইন প্রণয়নের আগেই থেমে গিয়েছিলো এ পরিকল্পনা। সিলেটের ক্ষেত্রে সেটি আবার নতুন করে ধরা দিলো।
ঢাকায় অনুষ্ঠিত সভায় সিলেট থেকে অন্যদের সাথে যোগ দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ। তিনি একাত্তরের কথা’কে বলেন, ‘সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সিলেটবাসীর প্রাণের দাবি। আমরা দাবি জানিয়েছি দ্রুততম সময়ের মধ্যেই অর্থাৎ চলমান মুজিব শতবর্ষের মধ্যেই সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আলোর মুখ দেখুক। এটি নানাকারণে বারবার পিছিয়ে গেছে। এটি যতোই পিছিয়ে যাবে ততোই সিলেটের ক্ষতির কারণ।’