গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল কত দূর?

বিশেষ প্রতিনিধি :: সিলেট থেকে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল কত দূর? গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল বিশ্বের মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে একটি পরিচিত নাম। কিন্তু এই গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গলের সঙ্গে কোনোভাবে সিলেট নামের কোনো যোগসূত্র তৈরি হতে পারে, সেটা একদিন ছিল অনেকেরই কল্পনার বাইরে। কিন্তু আসাম পুলিশের মহাপরিচালক সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে যা বলেছেন এবং তার সঙ্গে বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক উদ্বেগ (কক্সবাজার নয়, হাল জমানার নতুন মাদক রুট সিলেটের চার সীমান্ত) মিলিয়ে দেখলে মনে হতে পারে, মাদকের আণ্ডারওয়ার্ল্ড ডনদের স্বর্গরাজ্য গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল সিলেট এবং গৌহাটির মতো অঞ্চল থেকে বেশি দূরে নয়। ঐতিহাসিকভাবে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল এলাকাটি চীন, লাওস, থাইল্যান্ড এবং মিয়ানমার নিয়ে চিহ্নিত। যা লাখ লাখ কোটি টাকার মাদক ব্যবসার প্রধান উৎস হিসেবে কুখ্যাত।
আসামের পুলিশের ডিজি বিজে মহন্ত ২০২০ সালের মধ্য নভেম্বরে এক সাক্ষাৎকার দেন আসাম ট্রিবিউনকে। এতে তিনি বলেন, আসামে মাদকের বড় বড় চালান ধরা পড়েছে। এটা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বিশ্বের এই অঞ্চলটিতে ‘নারকো-টেরর অ্যাঙ্গেল’ এর উপস্থিতি রয়েছে। এর মানে মাদকের সঙ্গে সন্ত্রাসের যোগসূত্র। এখানে স্মরণ করা যায়, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর একাংশের বিরুদ্ধে সবথেকে বড় অভিযোগ, তারা গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গলের ড্রাগ মাফিয়া লর্ডদের পৃষ্ঠপোষক। তারাই মাদক বেচে কোটি কোটি টাকা বানিয়ে চলছে। সেই মিয়ানমারের পুলিশ গত মে মাসে ইতিহাসের বৃহত্তম সিনথেটিক মাদকের চালান আটক করেছে। ২৯০ কেজি হেরোইনসহ ১৯ কোটির বেশি মেথামফেটামিন ট্যাবলেট এবং ৫শ কেজি ক্রিস্টাল মেথামফেটামাইনস ট্যাবেলট উদ্ধার করে পুলিশ। এর বাইরে ছিল ৩৭শ লিটারের বেশি মেথিলফেন্টানিল। এই ফেন্টানিল হেরোইনের চেয়ে ৫০ গুণ এবং মরফিনের চেয়ে ১০০ গুণ বেশি শক্তিশালী মাদক। মিয়ানমারের মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্নেল জ লিন রয়টার্সকে বলেছিলেন, এই মাদক পণ্যের গন্তব্য ছিল মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বাজার এবং প্রতিবেশী দেশগুলো।
উল্লেখ্য, কোভিড-১৯ বাংলাদেশে আঘাত হানার আগেই একটি শিরোনাম জাতীয় মিডিয়ায় বড় জায়গা করে নিয়েছিল। সেটি ছিল: আর কক্সবাজার নয়, মাদকের নতুন সীমান্ত সিলেট। খবরে বলা হয়েছে, সিলেট বিভাগের চার সীমান্ত রুট নব্য ইয়াবা ব্যবসায়ীদের টার্গেটে। এরমধ্যে জকিগঞ্জ দিয়েই সবেচেয়ে বেশি ইয়াবা আসছে বলে সন্দেহ করেন আইনশৃঙ্খলা ও সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর সদস্যদের অনেকেই।
সূত্রগুলোর দাবি, ২০১৮ সাল থেকে সিলেটের এসব সীমান্ত দিয়ে ইয়াবার অনুপ্রবেশ শুরু হয়। ২০১৯ সালের মাঝামাঝি থেকে তা ব্যাপক রূপ নেয়। ১৯৯৭ সালে প্রথম ইয়াবা আনেন কক্সবাজারের মাদক ব্যবসায়ীরা। সেই থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ইয়াবা পাচারের একমাত্র রুট ছিল কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের সমুদ্র এলাকা। ২০১৮ সালের শেষ দিক থেকে সিলেটের জকিগঞ্জসহ কয়েকটি সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা পাচার শুরু হয়। শুরু হয় নতুন কালো অধ্যায়ের। সমুদ্র নয়। স্থল ও নদী সীমান্ত বেষ্টিত সিলেটই দিনে দিনে ভারতীয় মাদক সম্রাটদের রাডারে ধরা পড়েছে।
গত বছরের নভেম্বরে বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. সাফিনুল ইসলাম মিডিয়াকে বলেছিলেন, ইয়াবা পাচারের জন্য এখন সিলেট সীমান্ত ব্যবহৃত হচ্ছে। সিলেটে ইয়াবাসহ ধরা পড়া লোকজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এসব তথ্য বিজিবিকে জানিয়েছে।
২০১৯ সালের ১৫ জুন ঢাকার পিলখানায় বিজিবির সঙ্গে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) বৈঠক হয়। ওই বৈঠকের পর বিএসএফের মহাপরিচালক রজনীকান্ত মিশ্রও সাংবাদিকদের কাছে স্বীকার করেছিলেন, মিজোরাম সীমান্তে ইয়াবাসহ ভারতীয় নারী ও পুরুষকে তারা গ্রেপ্তার করেছেন। তারা বাংলাদেশে ইয়াবা পাচারের চেষ্টা করছিল।
আসাম পুলিশ প্রধান গত ১৫ নভেম্বর বলেন, মূলত মনিপুর ও মিজোরাম থেকেই মিয়ানমারের মাদক ঢুকছে গৌহাটিতে। এরপর তা ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন অংশে।
এখন প্রশ্ন হলো সিলেটের ৪ সীমান্ত রুটে কথিতমতে যে মাদক আসছে, তার মূল উৎস কোথায়? আসাম ট্রিবিউনকে পুলিশ প্রধান বলেছেন, আগস্ট এবং অক্টোবরে পুলিশ তিন লাখ ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করে একত্রে। কাছাকাছি সময়ে ১১ কেজি হেরোইন/ব্রাউন সুগারের সন্থান মেলে। মনিপুরের জনৈক মো. শাহরুখ খান এবং মো. তোহিবার কাছ থেকে ২০ আগস্টে উদ্ধার করা হয় ২০ কেজি ইয়াবা ট্যাবলেট। গৌহাটি, গোলাঘাট, নাগোন এবং বরাক উপত্যাকা থেকেও মাদক উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। এই রুটের সঙ্গে কানেকটিভিটি সুদূর গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল পর্যন্ত। আসাম পুলিশ শঙ্কিত যে, তিন মাসের ব্যবধানে এত বিপুল পরিমান মাদক উদ্ধার আগে ঘটেনি।
এখানে সিলেটবাসীর জন্য একটা আশঙ্কা থেকে যায়, করোনার মধ্য ওপারে যদি মাদক পাচারের অবনতি ঘটে, তাহলে তার চালানের জাল থেকে কি সিলেট অঞ্চল মুক্ত থেকেছে? করোনাকালে মাদকবিরোধী অভিযানে কি কোনো শৈথিল্য এসেছে? সবচেয়ে যে তথ্যটি আসাম পুলিশ প্রধানের ওই সাক্ষাৎকারে পরিষ্কার হয়েছে সেটা হলো, আসামে মেথামফেটামিনের উপস্থিতি। মি. মোহন্ত বলেছেন, করোনার মধ্যে গত আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে তাদের পরিচালিক অভিযানকালে মেথামফেটামিন উদ্ধারের ঘটনা আছে।
বাংলাদেশি মাদকবিরোধী ঘটনার পর্যবেক্ষকরা এখন স্মরণ করেন যে, ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথমবারের মতো মেথামফেটামিন নামের নতুন মাদক তৈরির কারখানার সন্ধান মিলেছিল রাজধানীর জিগাতলায়।
আসাম পুলিশের ডিজি বলেন, মিয়ানমারের আর্মি সাম্প্রতিককালে পপি চাষের ওপর ক্র্যাকডাউন চালিয়েছে। তাই মাদক মাফিয়ারা ধীরে ধীরে অপিয়াম থেকে উৎপন্ন মাদক থেকে সরে আসছে। এখন তারা সিনথেটিক মাদক তৈরির দিকে ঝুকেছে। এরমধ্যে প্রধান হলো মেথামফেটামিন। বিবিসির রিপোর্টমতে, চীনে এক গ্রাম মেথামফেটামিনের দাম ৮০ ডলার এবং অস্ট্রেলিয়ায় ৫শ ডলার।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে আসাম পুলিশ প্রধান বলেন, আসাম মাদক চোরাচালানিদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। কারণ গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল থেকে আসাম সন্নিকটে। এবং মিয়ানমার হচ্ছে এই ট্রায়াঙ্গলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই প্রসঙ্গে তিনি লক্ষণীয়ভাবে বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, আসামের সীমান্তবর্তী অঞ্চল মাদকচোরাচালানিদের কাছে প্রাধান্য পাচ্ছে। এরমধ্যে গৌহাটি মাদক চোরাচালানিদের প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ওই তিন মাসে গৌহাটি শহর থেকে যেসব মাদক উদ্ধার হয়, তাতে এটা পরিষ্কার যে, গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গলের সঙ্গে গৌহাটির সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে। উল্লেখ্য যে, গৌহাটির সঙ্গে সিলেটের সীমান্তবর্তী একাধিক শহরের রয়েছে ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা।
জাতিসংঘের মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ইউএনওডিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে শুধু ইয়াবা বড়ি বিক্রি হয় ৪০ কোটির বেশি, যার বাজারমূল্য প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা (প্রতিটি দেড় শ টাকা হিসাবে)। সরকারিভাবেই বলা হয়, দেশে মাদকসেবীর সংখ্যা ৬০ থেকে ৭০ লাখ।