জিয়ার খালের পাশে বঙ্গবন্ধুর গ্রাম

বিশেষ প্রতিনিধি :: গ্রামের নাম ডুংরিয়া। আলোচিত এক গ্রাম। পুরো সুনামগঞ্জজুড়ে প্রায় ৩ হাজার গ্রাম। তবে দক্ষিণ সুনামগঞ্জের অন্তর্গত ডুংরিয়া গ্রামটি এক নামে পরিচিত। ডুংরিয়ার পরিচিতি এবার পুরো দেশে ছড়িয়ে যাবে। ডুংরিয়াতেই হবে বঙ্গবন্ধুর নামাঙ্কিত ‘মডেল ভিলেজ’। দেশের মাত্র ১০টি গ্রামের ভাগ্যেই এমন সুযোগ মিলেছে। তিন দশক আগেও পাদপ্রদীপের আলোয় এসেছিলো ডুংরিয়া গ্রাম। আশির দশকের গোড়ার দিকে দেশের যে সকল এলাকাকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়া বেছে নিয়েছিলেন খাল খনন করতে, সেই সব এলাকার একটিও ছিলো ডুংরিয়া গ্রাম। তখন প্রযুক্তির এত প্রসার ছিলো না তাই ডুংরিয়ার নামটি খুব একটা ছড়িয়ে পড়েনি। এই গ্রামের সম্মুখ দিয়ে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের একাংশে খাল খনন হওয়ায় এখনো তা ‘জিয়ার খাল’ নামে পরিচিত। ভাগ্য সুপ্রসন্ন ডুংরিয়া গ্রামবাসীর। জিয়া সরকারের খাল খননের সুফল ভোগের পর এবার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নামে ‘মডেল ভিলেজ’ বাস্তবায়ন হচ্ছে সেই ডুংরিয়া গ্রামেই।
ডুংরিয়া গ্রামটি বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনায়। এ গ্রামের ভাগ্যে ঈর্ষান্বিত সুনামগঞ্জের অন্য গ্রামগুলো। ডুংরিয়ার কপালে জুটেছে অনেক কিছুই। আলোচনা-সমালোচনায় স্থান পরিবর্তন না হলে সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপিত হতো ডুংরিয়া গ্রামের সামনেই। বিশ্ববিদ্যালয় হয়নি কিন্তু পাদপ্রদীপের আলো থেকে সরে যায়নি ডুংরিয়া। এখানেই হবে স্বপ্নের ‘বঙ্গবন্ধু ভিলেজ’। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে তার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান জানাতে সমবায় অধিদপ্তর বঙ্গবন্ধুর সমবায় গ্রাম ধারণা ও বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের বিশেষ অঙ্গীকার ‘আমার গ্রাম-আমার শহর’ ধারণায় গ্রামের বৈশিষ্ট্য সমুন্নত রেখে ‘বঙ্গবন্ধু মডেল ভিলেজ’ প্রকল্পের প্রস্তাবনা তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে গ্রামের বৈশিষ্ট্য সমুন্নত রেখে গ্রামীণ সম্পদের সুষ্ঠু ও সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষির আধুনিকায়ন ও যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি, জৈব জ্বালানির ব্যবহার, যোগাযোগ ও বাজার অবকাঠামো সৃষ্টি, স্বাস্থ্য-শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে কমিউনিটির সচেতনতা বৃদ্ধি, তথ্যপ্রযুক্তিগত অবকাঠামো সৃষ্টির মাধ্যমে সব সেবা সহজলভ্য করা হবে। বাংলাদেশের ১০ জেলার ১০ উপজেলার ১০ গ্রামের গড়ে পাঁচ হাজার জন করে মোট ৫০ হাজার মানুষ প্রকল্পটির উপকারভোগী হবেন। এই ১০টির তালিকায় সিলেটে বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলার দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার জয়কলস ইউনিয়নের ডুংরিয়া গ্রাম।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বঙ্গবন্ধু মডেল ভিলেজ হলে কৃষিজমির সর্বোচ্চ ব্যবহার, মানবশ্রমকে যন্ত্রের মাধ্যমে প্রতিস্থাপন, উৎপাদন বৃদ্ধি, পোস্ট হারভেস্ট লোকসান কমানো, পানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পানির অপচয়রোধ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। এ লক্ষ্যে সরবরাহ করা হবে কৃষি যন্ত্রপাতি। প্রাথমিকভাবে প্রতি গ্রামে ৩০০ জন কৃষককে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। প্রতিটি গ্রামের জন্য কৃষি যন্ত্রপাতি কেনা হবে। বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আধুনিক ও মানসম্মত মাছ চাষের শ্রেষ্ঠ অনুশীলনের জন্য গ্রামে দুটি প্রদর্শনী পুকুর তৈরি করা হবে।
সারা বছরের আয় নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অফফার্ম কার্যক্রম হিসেবে গরু, ছাগল ও হাঁস-মুরগি পালনের মাধ্যমে মাংস ও দুগ্ধ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে আধুনিক ও মানসম্মত খামার ব্যবস্থাপনার কৌশলের ওপর গ্রামের নারী ও বেকার যুবকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। এ লক্ষ্যে গ্রামে প্রদর্শনী খামারে শ্রেষ্ঠ অনুশীলনের জন্য একটি মধ্যম আকৃতির খামার তৈরি করা হবে। এছাড়া প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবলের চাহিদার আলোকে ব্যক্তিপর্যায়ে চাহিদার ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিনাসুদে ঋণ দেয়া হবে, ৩ শতাংশ সার্ভিস চার্জসহ সেই ঋণ ফেরত দিতে হবে। ঋণ গ্রহণের তিন মাস পর থেকে ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হবে। এছাড়া কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ প্রদান করা হবে। ৩ শতাংশ সার্ভিস চার্জসহ ওই ঋণ ফেরত দিতে হবে। এক্ষেত্রে ঋণ গ্রহণের ছয় মাস পর থেকে ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হবে।
বঙ্গবন্ধু মডেল ভিলেজ প্রতিষ্ঠা পেলে ডুংরিয়া গ্রামের সব শ্রেণি-পেশার জনগণকে অন্তর্ভুক্ত করে গ্রাম সমবায় সমিতি গঠন করা হবে। সমিতিকে কেন্দ্র করে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত কমিউনিটি ভবন নির্মাণ করা হবে। কমিউনিটি ভবনে বঙ্গবন্ধু পাঠাগার ও বঙ্গবন্ধু কর্নার, কমিউনিটি হল, সমিতির অফিস, সভাকক্ষ, কম্পিউটার কেন্দ্র ও ডিজিটাল সেন্টার, স্বাস্থ্যসেবা প্রদান কেন্দ্র, বিভিন্ন কৃষি যন্ত্রপাতি রাখার গোডাউন, সংরক্ষণাগার, প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
প্রতি ইঞ্চি জমি আবাদের আওতায় আসবে অর্থাৎ এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি থাকবে না। রাস্তার ধার, নদীর পাড়, মাঠ এবং বাড়ির আঙিনায় আবাদ করা হবে। কোনো পুকুর মাছ চাষহীন থাকবে না। যৌথ পদ্ধতিতে চাষাবাদ হবে। কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহারের প্রচলন থাকবে। পরিবেশবান্ধব ও পানিসাশ্রয়ী সেচ ব্যবস্থা থাকবে। কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের পরিমিত ব্যবহার থাকবে এবং জৈব বালাইনাশকের ব্যবহার অনুশীলন করা হবে। কৃষি বহুমুখীকরণ চর্চা থাকবে। কৃষিপণ্যের বাজার নেটওয়ার্ক থাকবে। ফসলের সময়ের বাইরে (অফ-সিজন) কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে পশুপালন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কুটির পণ্য উৎপাদন ব্যবস্থা থাকবে।
ডুংরিয়ার সাফল্যের পেছনে বারবারই ঘুরেফিরে এসেছে একটি নাম। জিয়ার শাসনামলে যিনি ছিলেন ডাকসাইটে আমলা এখন তিনি কেবিনেটের প্রভাবশালী মন্ত্রী। তিনি পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। তাকে জন্ম দিয়েছিলো বলেই বারবার ঈর্ষার কারণ হচ্ছে ডুংরিয়া।