একটি ‘ছায়া’র গল্প

মঈন উদ্দিন :: সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভেতরের গেইট। মাঝের এই গেইট দিয়ে যুবা বয়সী একজন ভেতরে ঢুকছেন। তার রোগী আছে। দেখা করতে চান। সাথে আরো দু’তিনজন লোক আছেন, ২৫ থেকে ৩০ এর মধ্যে বয়স তাদের। একই সময়ে ‘মারামারির কারণে আহত’ এক কিশোর চিকিৎসা শেষে হাসপাতালের ওই গেইট দিয়ে বের হয়ে আসছিলো। তার সঙ্গী একই বয়সের আরো দুই কিশোর। তাদের চুল স্টাইল করে ছাঁটা। পেছনের দিকের অংশ ছোট। সামনের অংশ বিদঘুটে লম্বা। তাতে সোনালি রঙ দেওয়া। একজনের কানে আবার দুলও আছে। ক্যাডস পায়ে। সরু জিনসের সাথে ম্যাচ করে শার্ট পরা। শীতের মাঝেও খোলা বুক।
অসাবধানতাবশত ওই যুবকের সাথে ‘চিকিৎসা’ সেরে আসা ওই কিশোরের ধাক্কা লাগে। সাথে সাথে তর্ক বেঁধে যায় দু’পক্ষে। একপর্যায়ে কিশোরদের স্বর উঁচুতে চড়ে। ধমকের সুরে কথা বলতে থাকে। ভয় পেয়ে যান যুবক ও তার পক্ষের লোকজন। সেখানে জটলার সৃষ্টি হয়। এ সময় মধ্যস্থতা করে আরো কয়েকজন দর্শনার্থী বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা করেন। এই ফাঁকে যুবক ও তার সাথে থাকা লোকরা সটকে পড়েন। এটা টের পায় কিশোররা। তারা আরো ৬/৭ জনকে ডেকে আনে। তারাও একই বয়সী। তখন হঠাৎ করেই গেইট থেকে হাসপাতালের বাইরের মূল রাস্তার দিকে দৌড় দেয় ‘সংঘবদ্ধ’ কিশোররা। যুবক ও সাথে থাকা লোকজনকে ধাওয়া করাই উদ্দেশ্য। একপর্যায়ে কিশোররা ধরে ফেলে ওই যুবককে। রাস্তার উপরেই শুরু করে মারধর। একফাঁকে তাদের একজন প্যান্টের পকেট থেকে ধারালো চাকু বের করে। সজোরে আঘাত করে মাথার পেছন দিকে। চাকু দেবে গিয়ে যুবকের মাথার নিচ এবং ঘাড়ের উপরের অংশ ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়। রক্ত বের হতে থাকে মাথার পেছন থেকে।
ঘড়ির কাঁটায় তখন শুক্রবার রাত সাড়ে ১২টা। কিশোররা হইহুল্লোড় করেই আবার ‘ঠিকানায়’ ফিরছিলো। অঙ্গভঙ্গিতে বিরাট কিছু করে ফেলার তৃপ্তি। আচমকাই কিশোরদের আনন্দে বিষাদ নেমে আসে। ৪/৫ জন সাধারণ মানুষ রুখে দাঁড়ান। ধাওয়া করেন কিশোরদের। তারা পালাতে থাকে। এরই মধ্যে একজনকে হাতের নাগালে পেয়ে বসেন ধাওয়াকারীরা। তাকে ধরে উত্তম-মধ্যম দেন রাস্তার উপরেই। একসময় টেনে-হেঁচড়ে ওসমানীর মূল ফটকের ভেতরে নিয়ে আসা হয় কিশোরকে। সেখানেও সে ক্ষোভের আগুনে পোড়ে। একপর্যায়ে কিশোর স্বীকার করে ওসমানী হাসপাতাল এলাকায় তাদের ‘গ্যাং’ আছে। তার মতো অনেকেই নানা অপরাধ করে বেড়ায়। এসব শুনে উত্তম-মধ্যমদাতারা পুলিশে খবর দেন। কিশোরকে তাদের হেফাজতে নিয়ে যায়। এসময় সেখানকার অনেকেই জানান, ওসমানী হাসপাতাল এলাকায় ৭টির মতো কিশোর গ্যাং আছে। তারা বেপরোয়া এবং হিংস্র। আর আছে তাদের মাথার উপর ‘ছায়া’।
শুক্রবার রাত সাড়ে ১২টার ঘটনার সময় এই ছায়ার কণ্ঠ শোনেছেন উত্তম-মধ্যমদাতারা। তাদের একজনের হাতে জটলার মধ্য থেকে এক কিশোর হঠাৎ করেই মোবাইল ফোন ধরিয়ে দেয়। ওপাশ থেকে বলা হলো, যা হয়েছে সেটা ‘খারাপ’। অভিযুক্তকে পুলিশের হাতে তুলে দেন। তার পরিচয় জানতে চাওয়া হলে ওপাশের মৃদু কণ্ঠ, ‘আমি হোসাইন মোহাম্মদ সাগর’।
শনিবার খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ‘মধ্যস্থতা’ হয়ে যাওয়ায় ‘চাকু মারা’ ওই কিশোরকে শুক্রবার গভীর রাতেই ছেড়ে দেয় পুলিশ।