দেখার হাওরে শেখার দুয়ার

আনন্দ সরকার :: বর্ষা মৌসুমে চারদিকে থৈ থৈ করে স্বচ্ছ জল। এ জলের সাথে নীল আকাশের মিতালি চোখ জুড়িয়ে দেয় সবার। আর ফসলের মৌসুমে দিগন্তজুড়ে খেলা করে সোনালি ধান। বাতাসে ধানের দোল খাওয়া দেখে মনও নেচে উঠে আনন্দে। এখানে প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্যের দেখা মেলে সব সময়ই।
সুনামগঞ্জ সদর, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, দোয়ারাবাজার ও ছাতক চার উপজেলা নিয়ে সুনামগঞ্জের অন্যতম বৃহত্তম হাওর ‘দেখার হাওর’। বোরো ধানের ভান্ডার হিসেবে পরিচিত দেখার হাওরের পারেই এবার গড়ে উঠবে জ্ঞানের ভান্ডার, প্রকৃতির কোল ঘেঁষে খুলছে বিশ্বশিক্ষার দুয়ার। সুনামগঞ্জে বিশ্বপাঠের লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করতে যাওয়া সুনামগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হবে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ থেকে সুনামগঞ্জ সদরে প্রবেশপথ আহসান মারা সেতু এলাকায়, দেখার হাওর পারে। প্রকৃতির সাথে প্রযুক্তির যোগে অনন্য হয়ে উঠার স্বপ্ন দেখাচ্ছে দেখার হাওর। যে দেখার হাওর থেকে কৃষকের গোলা ভরে উঠে সোনার ফসলে সেই দেখার হাওরের পারে বসবে জ্ঞানের বাতিঘর, উঠে আসবে মণিমুক্তা। অনেক জটিলতার পর বুধবার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। ওইদিন দেখার হাওরের পারকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান হিসেবে চিহ্নিত করে সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সংশোধনী বিল সংসদ পাশ হয়েছে।
সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নিয়ে কম জল ঘোলা হয়নি। ২ মার্চ মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’ বিল অনুমোদন লাভ করে। বিলটি সংসদে উত্থাপিত হয় ৭ সেপ্টেম্বর। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় বিশ্ববিদ্যালয়টি দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। দক্ষিণ সুনামগঞ্জের সন্তান পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের আগ্রহেই মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান ঠিক করা হয়েছিলো দক্ষিণ সুনামগঞ্জে। পরে এ নিয়ে সুনামগঞ্জে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। হয় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। বিশ্ববিদ্যালয়টি সদর উপজেলায় স্থাপনের দাবিতে ২৫ অক্টোবর জেলা শহরে অনুষ্ঠিত হয় মানববন্ধন ও সমাবেশ। আর এর নেতৃত্ব দেন সুনামগঞ্জ-৪ আসনের (সদর ও বিশ্বম্ভরপুর) সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ। এমন পরিস্থিতিতে জরুরি সভা ডেকে সদর ও দক্ষিণ সুনামগঞ্জের সীমানা এলাকায় দেখার হাওরের পারে বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপনের প্রস্তাব করে রেজুলেশন করে জেলা আওয়ামী লীগ। রোববার রেজুলেশনের কপি দলীয় প্যাডে লিখিত আকারে পরিকল্পনামন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। অবশেষে দেখার হাওর পারেই সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সংশোধনী বিল সংসদে পাশ হয়েছে। জেলা আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এবং সুনামগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিকের প্রস্তাবে বুধবার জাতীয় সংসদে বিশ্ববিদ্যালয় বিল পাস হয়।
বিলটির উদ্দেশ্য ও কারণ সম্বলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে- উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রসরমান বিশ্বের সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা ও সমতা অর্জন এবং জাতীয় পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা বিশেষ করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে আধুনিক জ্ঞানচর্চা ও পঠন-পাঠনের সুযোগ তৈরি ও সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নীতিগত সম্মতির পরিপ্রেক্ষিতে সুনামগঞ্জ জেলায় সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের এই উদ্যোগ। সংসদে উত্থাপিত বিলটি অন্যান্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুসরণ করে প্রণয়ন করা হয়েছে। বিলে রয়েছে ৫৫টি ধারা। সংক্ষিপ্ত শিরোনাম, প্রবর্তন ও সংজ্ঞা ছাড়াও উল্লেখযোগ্য ধারাগুলোর মধ্যে ৯ ধারায় আচার্য, ১০-১১ ধারায় উপাচার্য, ১২ ধারায় উপউপাচার্য, ১৩ ধারায় কোষাধ্যক্ষ, ১৮-২০ ধারায় সিন্ডিকেট, ২১-২২ ধারায় অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল ও ২৯-৩০ ধারায় অর্থ কমিটি গঠন সংক্রান্ত বিধান রয়েছে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নিয়ে টানা হেঁচড়ায় পরিকল্পনামন্ত্রী যে সন্তুষ্ট নন তা বেশ স্পষ্ট। যদিও তিনি এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে বিল পাসের আগে এ ব্যাপারে তিনি ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছিলেন সুনামগঞ্জ-৪ আসনের (সদর ও বিশ্বম্ভরপুর) সংসদ সদস্যকে উদ্দেশ্য করে। বিল পাসের দু’দিন আগে সোমবার জগন্নাথপুরে এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে পীর মিসবাহকে উদ্দেশ্য করে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার শান্তিগঞ্জের কাছে একটি সুন্দর জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে আমরা একটা প্রস্তাব দিয়েছি। অনুমোদন আমি করতে পারি না। আমার ক্ষমতা নেই। কিন্তু একজন ব্যক্তি এর বিরুদ্ধে লেগেছেন। তিনি (পীর মিসবাহ) বলেন, এটি সদরে হতে হবে। কেন? সদর আর দক্ষিণ সুনামগঞ্জে কত দূরত্ব? সদর যেখানে শেষ, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ সেখানে শুরু। আমরা এটিকে দক্ষিণ সুনামগঞ্জেই রেখেছিলাম, এটা সুন্দর স্থান। বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য মানুষের বাড়িঘর ধ্বংস করতে হবে না। মাত্র তিনটি লন্ডনি বাড়ি সরাতে হবে। কোনো গরিব পরিবার নেই। কিন্তু ওই এমপি সাহেব বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয় সদরে হতে হবে। কেন, আমরা এটা বুঝি না? সদরে হলে, তিনি বলবেন, হ্যাঁ সদরবাসী দেখেন, আমি বিশ্ববিদ্যালয় এনেছি।’
সংসদে বিশ্ববিদ্যালয় বিলের সংশোধনী প্রস্তাব প্রসঙ্গে সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক ও দোয়ারাবাজার) আসনের সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক বলেন, সুনামগঞ্জে বিশ্ববিদ্যালয় উপহার দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। হাওর এলাকার মানুষের প্রতি তার দরদ ও ভালোবাসার বিষয়টি আবারও প্রমাণিত হলো। সুনামগঞ্জের কৃতি সন্তান পরিকল্পনামন্ত্রীর প্রতিও আমরা ঋণী। হাওরের বুকে উড়াল সড়ক, ছাতক-সুনামগঞ্জ রেললাইন স্থাপনসহ যেসব মেগা প্রকল্প রয়েছে, দেখার হাওরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে সবকিছুই একটি সমন্বিত রূপ পাবে। এখন দেখার হাওরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পরিবেশ, ভৌগোলিক অবস্থান ও পারিপার্শ্বিক সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় উপযুক্ত একটি স্থান নির্ধারণ করবে। আর সে জায়গাটির ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ থেকে সুনামগঞ্জ সদরে প্রবেশপথ আহসান মারা সেতু এলাকা।