কার টিকা আগে পাবে বাংলাদেশ

বিশেষ প্রতিনিধি :: ফাইজারের পরে আরো একটি মার্কিন কোম্পানি, নাম তার মডার্না, বলল, তাদের করোনা টিকা আরো বেশি কার্যকর হবে। ফাইজার বলেছিলে, তাদেরটা ৯০ ভাগ কার্যকর (অবশ্য বুধবার ফাইজারও দাবি করেছে তাদের টিকাও ৯৫ ভাগ কার্যকর)। সোমবার মডার্না বলল, তাদেরটা সাড়ে ৯৪ শতঅংশ কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। সব থেকে বড় কথা মডার্নার টিকা সাধারণ ফ্রিজে ৩০ দিন পর্যন্ত রাখা যাবে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এরকম টিকা সংরক্ষণ করা তুলনামূলক সহজ। বাংলাদেশ চুক্তি করেছে ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে। তারা অক্সফোর্ডের টিকার ট্রায়াল করছে। বাংলাদেশ পাবে সিরামের কাছ থেকে। সোমবার ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস মডার্নার খবর ছেপে বলেছে, সিরামের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মি. অ্যাডার পুনাওয়ালা ব্লুমবার্গকে বলেছেন, ডিসেম্বরে যদি টিকার শেষ পর্যায়ের ট্রায়ালে সাফল্য আসে তাহলেই তারা জরুরি ভিত্তিতে টিকা ব্যবহারের অনুমোদন চাইবে। এই সিরাম ইনস্টিটিউটের সাফল্যের সঙ্গে বাংলাদেশের টিকা লাভের ভাগ্য আপাতত জড়িয়ে আছে।
এখন একটি অভিন্ন প্রশ্ন ঢাকা ও লন্ডনে। প্রশ্নটি হলো, বাংলাদেশ বলেছে, অক্সফোর্ডের ৩ কোটি ডোজ টিকা কিনবে। কিন্তু অক্সফোর্ডের টিকা কবে মিলবে বাংলাদেশের তা নির্দিষ্টভাবে জানা নেই। লন্ডনিদেরও তা জানা নেই। বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, যদি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য কোনো বিদেশি উৎসের তৈরি কোভিড টিকা পায়, তাহলে কি দেশের সবাইকে একবছরের মধ্যে তা দেওয়া যাবে? তারা বলেন, এর উত্তর নেতিবাচক।
টিকা সক্ষমতা যাচাইয়ের দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সা¤প্রতিক প্রকল্পের আওতায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক এবং সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অর্থনীতির অধ্যাপক ফারজানা মুন্সি অন্যতম গবেষণা নহকারি হিসেবে কাজ করছেন। স¤প্রতি তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, টিকাগুলোকে গুদামে সংরক্ষণ বা পরিবহনের সময় কমপক্ষে ২ থেকে ৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখতে হবে। উৎপাদন থেকে শুরু করে কাউকে টিকা দেওয়ার আগ পর্যন্ত সম্পূর্ণ ব্যবস্থা তাপনিয়ন্ত্রিত রাখতে হবে।
উল্লেখ্য, সোমবার বিলাতি সংবাদপত্রে ফলাও করে ছাপা হলো মডার্নার কৃতিত্ব। এবং সেটা বিশ্বাসযোগ্য। তবে কথা হলো, দুই মার্কিন কোম্পানি, যারা টিকা দ্রুত বাজারজাতকাণে এগিয়ে আছে, তাদের কারো সঙ্গে চুক্তি করেনি ব্রিটিশ সরকার। সেকারণেই সোমবার বিলাতবাসীদের মুখে একটি কথাই রটেছে। তাহলে আমাদের কী হবে? প্রশান্ত মহাসাগরের এক পারে টিকা চলবে। অপর পারে চলবে না। তা কী করে হয়।
উল্লেখ্য, গত ৬ নভেম্বর করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট অক্সফোর্ডের তৈরি করা ৩ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন বাংলাদেশকে দেবে বলে জানিয়েছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ড. জাহিদ মালেক। বেক্সিমকো ফার্মার সঙ্গে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের করোনা ভ্যাকসিন সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পরে ওই ঘোষণা দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে বাংলাদেশকে করোনার ৩ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন দেবে সিরাম। প্রতি ব্যক্তির জন্য দুটি ডোজ। তাই দেড় কোটি মানুষকে দেয়া যাবে এ ভ্যাকসিন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যাস্ট্রাজেনেকার এই করোনাভাইরাস টিকা এখন পরীক্ষামূলক প্রয়োগের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এ বছরই তার চূড়ান্ত ফলাফল জানা যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু ধারণার মধ্যে নেই ফাইজার এবং মডার্না।
ডেইলি মেইল বলেছে, মডার্নার করোনা টিকা ৯৪.৫ শতাংশ কার্যকরী। সোমবার এক বিবৃতিতে দাবি আমেরিকার সংস্থা মডার্নার। ৩০ হাজার মানুষের উপর পরীক্ষামূলক ভাবে তাদের টিকা প্রয়োগ করা হয়েছে। এর ফলের ভিত্তিতেই এমন দাবি ।
সংস্থার প্রেসিডেন্ট চিকিৎসক স্টিফেন হগ বলেন, তৃতীয় পর্বের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পর দেখা যায় যে, তাদের তৈরি টিকা অনেক জটিল রোগের পাশাপাশি কোভিড-১৯ কেও রুখতে সক্ষম। এই টিকার এই কার্যকারিতার ঘোষণায় আশার আলো আরো বাড়ল মনে করছেন তিনি।
মি. হগ আরও জানান, তাদের পাশাপাশি অন্যান্য কয়েকটি সংস্থাও করোনার টিকা নিয়ে আশাপ্রদ ফল পেয়েছে। এটা স্বভাবতই একটা খুশির খবর। কিছু দিন আগেই ফাইজার-বায়োএনটেক দাবি করেছিল তাদের তৈরি টিকা ৯০ শতাংশ কার্যকরী। ৪৩ হাজার মানুষের উপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পর যে ফল পেয়েছে তারই ভিত্তিতে এই দাবি করেছিল ফাইজার।
হগ জানিয়েছেন, এ বছরের শেষে আমেরিকায় ২ কোটি টিকা সরবরাহের চিন্তাভাবনা চলছে। কয়েক দিনের মধ্যে এই টিকার অনুমোদনের জন্য আমেরিকার ড্রাগ কন্ট্রোলের কাছে আবেদন করা হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই টিকা চূড়ান্ত ভাবে কতটা কার্যকর হবে এবং প্রতিরোধ ক্ষমতা কত দিন ধরে রাখতে সক্ষম হয় এখন সেটাই দেখার বিষয়।
মডার্নার প্রেসিডেন্ট ডা. স্টিফেন হোগ আরো বলেন, এটা সত্যি একটা মাইলস্টোন। দি এপিকে হোগ বলেছেন, ‘‘এটা আমাদের সকলের কাছে আশার আলো। আসলে একটা ভ্য়াকসিন এই অতিমারী রুখতে সক্ষম। তাঁর আরও কথায়, ‘‘এটা মডার্না একা এই সমস্যা মেটাতে পারবে না। বিশ্বজুড়ে চাহিদা মেটাতে আরও অনেক ভ্য়াকসিন জরুরি।
উল্লেখ্য, বিলাতের ফিনান্সিয়াল টাইমস গত ১৬ অক্টোবর ফ্রাংকফুর্ট থেকে খবর দিয়েছিল, ফাইজার জরুরি ভিত্তিতে মার্কিন ড্রাগসের অনুমোদন পেতে নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানাবে । এবিষয়ে এক খোলা চিঠিতে ফাইজারের প্রধান নির্বাহী অ্যালবার্ট ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, ট্রাস্প তাদের টিকার বিষয়ে ভোটের আগে একটি ঘোষনা দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তারা রাজনীতিতে জড়াতে চাননি। এটা রিপাবলিকান টিকা হবে নাকি ডেমোক্রাট টিকা হবে, তা নিয়ে তারা চিন্তিত নন।
সোমবার দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, সিরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া যারা অক্সফোর্ডের পক্ষে দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের টেস্ট চালাচ্ছে, তারা বলেছে, ডিসেম্বরের মধ্যে ১০ কোটি ডোজ টিকা তৈরি করার লক্ষ্য স্থির করেছে সিরাম।