বীর জগৎজ্যোতি কেন শ্রেষ্ঠ নন?

সাঈদ চৌধুরী টিপু :: ১৯৭১ থেকে ২০২০। ৪৯ বছর। এ বছরের ক্যালেন্ডারের পাতা শেষ হলে শুরু হবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার অর্ধশততম বছর। দীর্ঘ এ সময়ে জবাব মেলেনি একটি প্রশ্নের। একাত্তরের উত্তাল দিনে ইথারে ভেসে আসা ঘোষণা কেন বাস্তবায়িত হল না ৪৯ বছরেও। কেন শ্রেষ্ঠ বীরের খেতাব পেলেন না জগৎজ্যোতি। বীরের খেতাবে তার জায়গা হয়েছে তৃতীয় সারিতে- বীরশ্রেষ্ঠ, বীরউত্তমের পর। শ্রেষ্ঠ বা উত্তম কোনো খেতাবেই কিছু যাওয়ার-আসার ছিল না। যখন ঘোষণা আসে তিনি তখন সব হিসেব নিকেশের উর্ধ্বে উঠে চলে গেছেন পৃথিবীর ওপারে। দায় তাদের যারা দেখেছেন, শুনেছেন জগৎজ্যোতির অসম সাহসিকতার গল্প।
পুরো নাম জগৎজ্যোতি দাস। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ছিলো মাত্র ২২। সেই তরুণ বয়সেই তিনি কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিলেন পাক বাহিনী ও তার দোসরদের বুকে। তার নামে গড়ে উঠা গেরিলা পার্টি হায়েনাদের কাছে ছিলো এক মূর্তিমান আতঙ্ক। জগৎজ্যোতির দাস পার্টির মুখোমুখি হওয়া মানেই পাক বাহিনীর একটি পরাজয়ের গল্প। দাস পার্টির একেকটি অপারেশন মানে বাঙালির বিজয় নিশান উড়ানোর একেকটি গর্বিত অধ্যায়। ১৯৭১ সালের ১৬ নভেম্বর হবিগঞ্জের বাহুবলের পথে বদলপুরে পাকিস্তানি বাহিনীর দোসরদের ফাঁদে পড়ে সম্মুখযুদ্ধে প্রাণ হারান একাত্তরের বীর সেনানী জগৎজ্যোতি দাস। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত জগৎজ্যোতি ছিলেন উত্তর-পূর্ব রণাঙ্গনে ভরসার কেন্দ্রস্থল। জগৎজ্যোতির প্রতি নিজেদের ক্ষোভ থেকে রাজাকাররা তাঁর নিথর দেহটির সাথে অমানবিক আচরণ করে। ধারালো অস্ত্র দিয়ে খুঁচিয়ে জগৎজ্যোতির প্রাণহীন দেহটি বিবস্ত্র করে ভাসিয়ে দেয় ভেড়ামোহনা নদীর জলে। জগৎজ্যোতির আত্মত্যাগের সংবাদটি সে সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, অল ইন্ডিয়া রেডিওসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচার ও প্রকাশ হয়। তার অসীম সাহসিকতার প্রতি সম্মান জানিয়ে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারে পক্ষ থেকেই তাকে মরণোত্তর সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় খেতাব প্রদানের ঘোষণা দেয়া হয়। এ ঘোষণা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ও অল ইন্ডিয়া রেডিওতেও প্রচার হয়। কিন্তু প্রতিশ্রুত সে খেতাব আজও মেলেনি জগৎজ্যোতির। অবশ্য পরবর্তীতে সান্ত¡না হিসেবে ১৯৭২ সালে বীরবিক্রম খেতাব দেওয়া হয় জগৎজ্যোতিকে। ঘোষণা দিয়েও কেন জগৎজ্যোতিকে মরণোত্তর সর্বোচ্চ খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ সম্মানে ভূষিত করা হলো না সে প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত। এ নিয়ে ক্ষোভ আছে অনেক মুক্তিযোদ্ধারও। বীরপ্রতীক খেতাব বর্জনকারী মুক্তিযুদ্ধে ৪নং সেক্টরের সাব কমান্ডার মাহবুবুর রব সাদী এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি নিজে অন্তত তিনজনকে জানি যাদের বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব পাওয়া উচিত ছিল।… এদের একজন জগৎজ্যোতি।… তার ভাষ্য, ‘মুক্তিযুদ্ধে অসীম সাহসী বীরত্ব প্রদর্শন করেও যারা যথাযথ মূল্যায়ন ও খেতাব পাননি তাদের আত্মার প্রতি সম্মান দেখাতেই আমি খেতাব ও সম্মান বর্জন করেছি।’