লাউয়াছড়ায় সংকটে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী

কমলগঞ্জ প্রতিনিধি :: একটি গবেষক দলের দীর্ঘ প্রায় ৬ বছর ধরে চলা গবেষণা ও অনুসন্ধানে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে নতুনভাবে ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ ও উভচর শ্রেণির প্রাণী সনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি প্রজাতির প্রাণীর অস্তিত্ব বাংলাদেশে নতুন বলে তারা দাবি করছেন। তবে আগের ২৩ প্রজাতির সন্ধান আর মিলেনি। ২০১১ সাল থেকে ২০১৭ পর্যন্ত ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স (ক্যারিনাম) এই গবেষণা পরিচালনা করে। গবেষকদের মতে, প্রতিবেশগত নানা সংকটে আগামী কয়েক বছরে লাউয়াছড়ায় কিছু প্রজাতি বিলুপ্তের আশঙ্কা রয়েছে। তবে বন্যপ্রাণী বিভাগ গবেষক দলের প্রতিবেদন এখনও পুরোপুরি আমলে নেয়নি।
বন্যপ্রাণী বিভাগসূত্রে জানা যায়, লাউয়াছড়ায় ৪৬০ প্রজাতির দুর্লভ উদ্ভিদ ও প্রাণীর মধ্যে ১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৪ প্রজাতির উভচর, ৬ প্রজাতির সরীসৃপ, ২৪৬ প্রজাতির পাখি এবং ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী রয়েছে। এদের মধ্যে উল্লুক, হনুমান, ছোট লেজি বানর, লজ্জাবতি বানর, সজারুসহ বিরল প্রজাতির প্রাণীর বাসস্থান লাউয়াছড়ার বন। তবে গবেষণাকারী দলের অনুসন্ধানে নতুন কিছু প্রাণী সনাক্ত হলেও আগের কিছু প্রাণীর সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে তারা দাবি করছেন। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্রের চেকলিস্টে এই গবেষণাটি প্রকাশ করা হয়েছে। গবেষণাকারী দলের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ডেলটা স্টেট ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ড. এএইচএম আলী রেজা তার পিএইচডি গবেষণায় ২০১০ সালে লাউয়াছড়ায় ৪৫ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ১৫ প্রজাতির উভচর প্রাণীর কথা উল্লেখ করেন। এত দিনের গবেষণায় ৫১ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ২০ প্রজাতির উভচর প্রাণী শনাক্ত করা হয়। সর্বশেষ গবেষণামতে এই জাতীয় উদ্যানে সর্বমোট ৭১ প্রজাতির উভচর ও সরীসৃপ জাতীয় প্রাণীর সন্ধান মিলেছে। নতুনভাবে পাওয়া সরিসৃপ ও উভচর প্রাণীদের মধ্যে ১১টি বাংলাদেশে নতুন ও এর আগে কেউ এদের অস্থিত্ব আবিষ্কার করতে পারেনি বলে তাদের দাবি। প্রাপ্ত ১১ প্রজাতির বাংলা নামকরণ প্রক্রিয়াধীন।
গবেষক দলের মতে, আগে ছিল এমন ২৩ প্রজাতির সরীসৃপ ও উভচর প্রাণী পাওয়া যায়নি। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের উভচর ও সরীসৃপ জাতীয় প্রাণীর ওপর এক গবেষণায় এ তথ্য জানা যায়। বাংলাদেশ বন-বিভাগের সহযোগীতায় এই গবেষণাটি চালানো হয়। গবেষক দলের আশঙ্কা, প্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট, বনে পানি সংকট, পাশের চা বাগানে কীটনাশকের ব্যবহারসহ বনের মধ্যে নানাবিধ প্রতিবেশগত যে সংকট তাতে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকিতে ফেলবে। আগামী কয়েক বছরে বেশ কিছু প্রজাতি বিলুপ্তও হয়ে যাবে।
গবেষক দলের প্রধান শাহরিয়ার রহমান সিজার জানান, আগের গবেষণায় ২৩ প্রজাতির যেগুলো লাউয়াছড়ায় আছে বলে ভাবা হতো সেগুলো আমাদের গবেষণাতে ধরা পড়েনি। সেগুলো ভূলভাবে শনাক্ত করা হয়েছে ধরে নিয়ে আমরা তা লিস্ট থেকে বাদ দিয়েছি। তিনি আরও জানান, ২০১১ সালে বাংলাদেশ পাইথন প্রজেক্টের অধীনে এই বনে অজগর সাপের ওপর গবেষণা শুরু হলে বনের জীব বৈচিত্র্যের নানা ক্ষেত্র উঠে আসে। উভচর শ্রেণীর প্রাণীর মধ্যে ১৯ প্রজাতির ব্যাঙ এবং মাত্র ১ প্রজাতির সিসিলিয়ান জাতীয় প্রাণী পাওয়া গেছে। সরীসৃপ শ্রেণীর মধ্যে পাওয়া গেছে ২ প্রজাতির কচ্ছপ, ১৪ প্রজাতির টিকটিকি জাতীয় (২ প্রজাতির গুইসাপসহ) এবং ৩৫ প্রজাতির সাপ। যার মধ্যে মাত্র ৬ প্রজাতির বিষাক্ত সাপ রয়েছে। এই প্রজাতিগুলোর মধ্যে রাজ গোখরা, অজগর ও পাহাড়ি হলুদ কচ্ছপও রয়েছে। গবেষণার প্রতিবেদন নিয়ে শীঘ্রই বন্যপ্রাণী বিভাগ ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়ে লাউয়াছড়ায় মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হবে বলে তিনি জানান।
এ বিষয়ে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বনকর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, নতুন নতুনভাবে কিছু প্রাণী পাওয়া যাচ্ছে। প্রকৃতিতে নতুনভাবে এমন অনেক প্রাণীরই আবির্ভাব ঘটে। গবেষক দল তাদের গবেষণার বিষয়ে ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করবেন। তারপর যাচাই-বাছাই করে দেখা হবে। বন্যপ্রাণীর জন্য সমস্যাগুলো সমাধানের ব্যাপারে আমাদের আন্তরিকতা এবং দায়িত্ববোধ আছে ও থাকবে।