মোদীর দিকে রাহুলের ‘বাংলাদেশ বাণ’

বিশেষ প্রতিনিধি :: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্য প্রসঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দিকে বাণ ছুড়লেন রাহুল গান্ধী। ৮ নভেম্বর ছিল ভারতীয় টাকার নোটবন্দির চার বছর পূর্তি। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর কালো টাকা, জালনোট, সন্ত্রাসবাদি অর্থায়নের বিষয় রুখে দেওয়ার কথা বলে আগে থেকে প্রচলিত ৫শ এবং এক হাজার টাকার নোট নাটকীয়ভাবে বাতিল করেছিলেন।
তখন বলা হয়েছিল, প্রতিবেশী বাংলাদেশের সীমান্ত রুটে চলাচল হওয়া ভারতীয় জাল নোট ভারতের অর্থনীতিকে চাপে রেখেছে। এছাড়া উঠতে বসতে বিজেপির এক শ্রেণীর নেতারা জিগির তুলেন, বাংলাদেশিরা গরিব, তারা সুযোগ পেলেই কাটাতারের বেড়া ফসকে ভারতে আসে উন্নত চাকরি ও জীবনের আশায়। সেকারণে তারা সীমান্তে পাখির মতো বাংলাদেশি মারে। শিশু ফেলানি যার একটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। অনেকে তাই বলছেন, রাহুল গান্ধীর কটাক্ষ ভারতের প্রধানমন্ত্রী বিদ্ধ হলেও বাংলাদেশ ঋদ্ধ হয়েছে। গত কয়েক বছরে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক দিকে বলেছে, ভারতে বিশ্বের টপ টেন রেমিট্যান্স প্রেরণকারী দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। হাজার হাজার ভারতীয় বৈধ ভিসা ছাড়াই বাংলাদেশে নিরাপদে কাজ করেন। এবং টাকা প্রেরণ করেন। বিপরীতে ভারত বাংলাদেশি অভিবাসী ‘¯্রােত’ ঠেকানোর কথা কল্পনা করে তারা এনআরসি কায়েম করেছে। বাংলাদেশকে নিষিদ্ধ করে তারা লোকসভায় বিল পাস করেছে। এরকম একটি প্রেক্ষাপটে আইএমএফ সম্প্রতি ইঙ্গিত দিল, বাংলাদেশ এই করোনার মধ্যেও চলতি অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ভারতকে টপকে যাবে।
ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ডের (আইএমএফ)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২০ সালে বাংলাদেশের সম্ভাব্য মাথাপিছু জিডিপি চার শতাংশ বেড়ে হতে পারে এক হাজার ৮৮৮ ডলার। সেখানে ভারতের সম্ভাব্য মাথাপিছু জিডিপি ১০ দশমিক পাঁচ শতাংশ কমে হতে পারে এক হাজার ৮৭৭ ডলার। অর্থাৎ, এই প্রথম মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশ ভারতের থেকে ১১ ডলার এগিয়ে যেতে পারে।
স্বাভাবিক ভাবেই আইএমএফ-এর এই রিপোর্ট নিয়ে ভারতে বিতর্ক দেখা দেয়। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী এর আগে টুইট করে বলেছেন, পাঁচ বছর আগেও যেখানে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি বাংলাদেশের চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি ছিল, সেখানে আইএমএফ-এর রিপোর্ট অনুযায়ী ভারত বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে যেতে পারে। মোদী সরকারের ব্যর্থতার এটাই সবচেয়ে বড় উদাহরণ। এক মাস না যেতেই রাহুল পুনরায় একই বাণ নিক্ষেপ করেন।
গত রোববার প্রধানমন্ত্রী মোদী টুইট বার্তা করেন। এই বার্তায় বলা হয়, নোটবাতিলের সেই সিদ্ধান্তের ফলে কালো টাকার পরিমাণ কমেছে। কর প্রদান করার হার বেড়েছে। এবং মুদ্রা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফিরে এসেছে। একই দিনে দেশের কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন একাধিক টুইট করেন এই বিষয়টি নিয়ে। অর্থমন্ত্রীর কথায়, ডিমনিটাইজেশনের সেই সিদ্ধান্ত সুফল এনেছে এবং করের হারকে আরো প্রশস্ত করেছে। শুধু তাই নয়, এটি জাল নোটের বাণিজ্য রোধ করেছে এবং নোটের সঞ্চালন বৃদ্ধি করেছে।
ভারতের এই নারী অর্থমন্ত্রী মনে করেন, কালো টাকার উপরে ওই অভূতপূর্ব আক্রমণের ফলে আগের থেকে কর ফাঁকি দেওয়া বন্ধ হয়েছে। ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসার ঘটেছে। নোট বন্দির পর প্রথম চার মাসেই ৯০০ কোটি টাকার অপ্রকাশিত আয় বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। আর গত তিন বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। তার দাবি ভারতকে দুর্নীতি থেকে মুক্ত করার অঙ্গীকার রক্ষা করতে গিয়েই মোদি সরকার চারবছর আগে এই পদক্ষেপ নিয়েছিল।
তবে তাঁর এই বক্তব্যকে নাকচ করে দিয়েছেন দেশটির প্রধান বিরোধী দল। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী গোড়া থেকেই মোদি সরকারের এই ডিমনিটাইজেশন নীতির কঠোর সমালোচনা করে আসছেন। রাহুল সেই বিরোধিতার ধারাবাহিকতায় আবারো উল্লেখ করেছেন, ‘কয়েকজন অন্তরঙ্গ পুঁজিবাদী বন্ধুকে’ সহায়তা করতে চার বছর আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। আর এই পদক্ষেপের ফলে ভারতীয় অর্থনীতি ধ্বংসপ্রাপ্ত আজ।
রাহুল প্রশ্ন তুলেছেন, একসময় বিশ্বের অন্যতম সেরা পারফর্মিং অর্থনীতির দেশ হিসেবে পরিচিত ভারতের অর্থনীতিতে বাংলাদেশ টেক্কা দিল কি করে?
তার কথায়, ‘দেশের অর্থনৈতিক মন্দার কারণ হিসেবে কেন্দ্রীয় সরকার করোনার দোহাই দিলেও আমরা মনে রাখব, করোনা শুধু ভারতেই আসেনি বাংলাদেশেও এসেছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এসেছে।
রাহুল বলেন, ভারতীয় অর্থনীতির পিছিয়ে পড়ার আসল কারণটি হলো ডিমনিটাইজেশন এবং জিএসটি। চার বছর আগে থেকে প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদী ভারতীয় অর্থনীতিতে আক্রমণ শুরু করেছিলেন। নোটবন্দি করার ফলে কৃষক শ্রমিক দোকানদাররা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
সাবেক কংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ অর্থনীতির এই পতন সম্পর্কে যে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন তাই সত্যে পরিণত হয়েছে। সিলেটের পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আইএমএফ এমন একটি পূর্বাভাস দিয়েছে যাতে ভারতের রাজনীতির সেই অংশের মুখচুন হয়েছে, যারা বাংলাদেশকে অযথা খোচা দেওয়াটা অভ্যাসে পরিণত করে ফেলেছিলেন।