পুলিশের ব্রিফিং : গ্রেপ্তার আমরাই করেছি

স্টাফ রিপোর্ট :: কানাইঘাট থেকে সোমবার সকাল ৯টায় গ্রেপ্তারের পর সন্ধ্যা ৫ টা ৫২ মিনিটে কড়া নিরাপত্তায় সিলেট নগরীর বন্দরবাজারস্থ জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয় এসআই আকবরকে। সিলেটের পুলিশ সুপার ফরিদ উদ্দিন নিজেই তার অফিসার-ফোর্সদের সাথে নিয়ে কানাইঘাট থেকে এসআই আকবরকে সিলেটে নিয়ে আসেন। গাড়ি থেকে নামিয়েই নীল রঙের একটি গেঞ্জি ও গামছায় মুখ ঢাকা আকবরকে নিয়ে যাওয়া হয় পুলিশ সুপার কার্যালয়ের ভেতরে। এরপর সাংবাদিকদের সামনে আর বের করা হয়নি তাকে। মিনিট দশেক পর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে উপস্থিত হন সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ। সিলেটের গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতে শুরু হয় প্রেসব্রিফিং।

শুরুতেই পুলিশ সুপার ফরিদ উদ্দিন গ্রেপ্তার প্রক্রিয়া সম্পর্কে সাংবাদিকদের অবহিত করেন। তিনি জানান, রায়হান হত্যাকাণ্ডের পরে আজকে ২৯ তম দিন অতিবাহিত হল। আমরা হত্যাকাণ্ডের ৩ দিন পর থেকেই এসআই আকবরকে গ্রেপ্তারের পরিকল্পনা করা হয় এবং সেই অনুযায়ী বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালিত হয়। ফরিদ উদ্দিন বলেন, সে যে সমস্থ জায়গায় পালিয়ে থাকতে পারে সেই সমস্থ লোকজনকে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করেছি এবং তাদের বাড়িও তল্লাশি করেছি।

রোববার আমাদের কাছে একটি বিশেষ ইনফরমেশন আসে যে, এসআই আকবর ইন্ডিয়াতে পালিয়ে যেতে পারে। এর প্রেক্ষিতে আমরা রোববার রাত থেকেই কানাইঘাট সীমান্ত এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করি। এটুকুও বলে রাখি আপনাদেরকে, আমরা যখনই খবর পেলাম সে দেশ থেকে বিদেশে পালিয়ে যেতে পারে, সে সময় আমরা জেলা পুলিশের উদ্যোগে বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকাতে নিরাপত্তা জোরদার করেছিলাম এবং সংশ্লিষ্ট অফিসার ইনচার্জদের নির্দেশনা দিয়ে রেখেছিলাম। আমাদের কাছে ইনফরমেশন ছিলো, আকবর কানাইঘাট সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে যেতে পারে। সে হিসেবে আমরা অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করি। এ মিশনে সরাসরি নেতৃত্ব দেন আমাদের ওসি কানাইঘাট এবং ওসি জকিগঞ্জ। এছাড়াও আমার অন্য সিনিয়র কর্মকর্তাবৃন্দ সবাই এটার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।

বিশেষ করে আমি স্মরণ করব বাংলাদেশ পুলিশের অভিভাবক ইনস্পেক্টর জেনারেল ড. বেনজীর আহমেদ। তিনি প্রত্যক্ষভাবে নির্দেশনা প্রদান করেছেন। সে সব নির্দেশনাগুলো আমি আমাদের রেঞ্জের অভিভাবক ডিআইজি মহোদয়ের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পেয়েছি। মূলত ডিআইজির নির্দেশনা বাস্তবায়নে আমাদের পথ অনেকটা সুগম হয়ে যায়। সোমবার সকালে কানাইঘাট দোনা সীমান্তবর্তী এলাকায় এসআই আকবর ইন্ডিয়াতে পলায়নরত অবস্থায় আমাদের সাদা পোষাকে পুলিশ ছিলো, তারা তাকে গ্রেপ্তার করতে সমর্থ হয়। গ্রেপ্তার করে আমরা ইতিমধ্যেই তাকে নিয়ে এসেছি। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আমাদের কথা হয়েছে। সিলেটবাসীকে আমরা আশ্বস্থ করতে চাই, সুনির্দিষ্টভাবে যথাযথ শাস্তির উদ্দেশ্যে এই বিচার প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে যা করণীয় তার সর্বোচ্চটাই করা হচ্ছে। আমরা আপনাদের আস্থা রাখার আহবান জানাই। আমাদের সবচাইতে প্রেস্টিজিয়াস একটা অর্গানাইজেশন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এই মামলা তদন্ত করছে। আমরা ইতিমধ্যে পিবিআইর এসপি সাহেবের সাথে কথা বলেছি।

সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, আইনের উর্ধ্বে কেউ নয়। আইন অমান্য করলে সে যেই হোক না কেনো, যে সংস্থায় চাকরি করুক না কেন, তাকে আইনের দোরগোড়ায় সোপর্দ হতে হবে। সিলেট জেলা পুলিশ, সিলেট রেঞ্জ তথা বাংলাদেশ পুলিশ এবং আইজিপি মহোদয় এটা প্রমাণ করলেন যে, কেউ আইন অমান্য করলে তাকে অবশ্যই আইনের দোরগোড়ায় পৌছাতে হবে এবং বিচারের সম্মুখীন হতে হবে। এসআই আকবর যে অন্যয় করেছে, অত্যন্ত জঘন্য কাজ করেছে। এর শাস্তি তাকে পেতেই হবে, এটা আমরা চাই। আপনারা জানেন যে, কিছুদিন আগে এমসি কলেজে একটি ঘটনা ঘটেছিলো। সেখানে সিলেট রেঞ্জের সিলেট জেলাসহ সুনামগঞ্জ এবং হবিগঞ্জ জেলা পুলিশ চারটি আসামি ধরে দিয়েছিলো এক নম্বর আসামিসহ। সুতারং আইন অমান্য করে আমাদের নেটওয়ার্ক থেকে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমরা অবশ্যই দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও সুদৃঢ় করতে বদ্ধপরিকর।

সাংবাদিকরদর প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার ফরিদ উদ্দিন জানান, একটা ভিডিও এসেছে। সেটা সম্পর্কে আমি কিছু বলতে পারব না। গ্রেপ্তারের সাথে সরাসরি সিলেট জেলা পুলিশ জড়িত। জেলা পুলিশের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে আমরা তাকে গ্রেপ্তার করেছি। কিন্তু এর আগে যদি কেউ ভিডিও করে থাকে সেটা অন্য বিষয়। কিন্তু জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে কেউ কোনো ভিডিও করে নাই। আমরা পুলিশিং কাজে মানুষের সহযোগিতা নিয়ে থাকি। এখানে আমাদের নির্ভরযোগ্য বন্ধু ছিলো, যারা আমাদের গ্রেপ্তার কাজে সহযোগিতা করেছে।

আকবর ভারতে পালিয়ে গিয়েছিলো কি না এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার বলেন, এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ নাই। আমরা কিন্তু ভারত থেকে ধরিনি। আমরা বাংলাদেশি সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ধরেছি। আমরা তাকে নিয়ে এসেছি, জিজ্ঞাসাবাদ আমরা করব। পিবিআইও জিজ্ঞাসাবাদ করবে । সে আদৌ পালিয়েছিলো কি না, এমনটাও হতে পারে সে একবার পালিয়ে গেছে, এবার নিজে থেকে এলাকায় ঢুকতে চেয়েছে। আবার এমনও হতে পারে, সে এখন বাংলাদেশ থেকে ইন্ডিয়া যাওয়ার পথে গ্রেপ্তার হয়েছে। এটা দুইটা প্রক্রিয়ায় হতে পারে। সুতরাং কোনটা হয়েছে, সেটা জিজ্ঞাসাবাদ না করে বলা যাচ্ছে না। আমি আবারও সুনির্দিষ্টভাবে বলতে চাই, আমরা তাকে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছি। আমাদের কাছে ইন্টিলিজেন্স ছিলো। আমাদের কাছে কেউ আকবরকে হ্যান্ডওভার করেনি। তবে আমাদের কিছু বিশ্বস্ত বন্ধু এই গ্রেপ্তার কাজে আমাদের সহযোগিতা করেছে।

কিছু পুলিশ কর্মকর্তার পরামর্শে আকবর পালিয়েছেন, সেই কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করার ব্যপারে পুলিশ সুপার বলেন, যারা আকবরকে সহযোগিতা করেছে তাদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এটায় দুটো প্রক্রিয়া আছে। একটা হচ্ছে মামলা এবং আরেকটি হচ্ছে, পুলিশের গঠিত বেশ কয়েকটি তদন্ত কমিটি। পিবিআইও তদন্ত করছে। যে বা যারা আকবরকে সহায়তা করেছে, তাদের খুঁজে বের করা হবে।

পুলিশ সুপার আরো বলেন, আমরা আকবরকে পিবিআই’র কাছে হস্তান্তর করার পর তারা ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আকবরের জবানবন্দি রেকর্ড করার চেষ্টা করবে। জিজ্ঞাসাবাদ যখন শেষ হবে, তখন আকবরকে কারাগারে প্রেরণ করা হবে।

আকবরকে পালাতে সহায়তাকারী নোমানের ব্যাপারে এসপি ফরিদ উদ্দিন বলেন, নোমান এখনো পলাতক। আমরা জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে নোমানের বাবা, মা এবং স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। আমরা নোমানকে ধরার জন্য চেষ্টা করেছি। যেহেতু আমাদের মূল টার্গেট (আকবর) ধরা পড়ে গেছে। আমরা তার সাথে নোমানের সংশ্লিষ্টতা বের করে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করব। ফরিদ উদ্দিন জানান, সোমবার আকবরকে সকাল ৯টায় গ্রেপ্তার করা হয়।