দু’দিন আগেই ধরা পড়েন আকবর

স্টাফ রিপোর্ট :: অবশেষে ‘গ্রেপ্তার’ হয়েছেন বন্দরবাজার ফাঁড়িতে পুলিশী নির্যাতনে নিহত রায়হান হত্যা মামলার মূল অভিযুক্ত বহিস্কৃত ফাঁড়ি ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া। কানাইঘাট সীমান্ত এলাকা থেকে আকবরকে গ্রেপ্তারের দাবি করছে পুলিশ। কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভারতীয় খাসিয়ারাই আটক করে বাংলাদেশি এক চোরাচালানির হাতে আকবরকে তুলে দেয়।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দুদিন আগেই ধরা পড়েন আকবর। শনিবার রাতে একটি খাসিয়া পানপুঞ্জিতে খাসিয়াদের হাতে আটক হন এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া। ওই রাতে পানপুঞ্জির হেডম্যানের (গ্রাম প্রধান) হেফাজতেই ছিলেন আকবর। ওই খাসিয়া পল্লীর হেডম্যান যোগাযোগ করেন পুলিশ ও বিজিবির সোর্স হিসেবে পরিচিত কানাইঘাট উপজেলার লক্ষ্মীপাশা ইউনিয়নের দনাছড়া গ্রামের মৃত তরফ আলীর ছেলে গরু চোরাচালানি রহিম উদ্দিনের সাথে। আকবরকে আনতে বিনা পাসপোর্টে ৫ জন সঙ্গীকে নিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন রহিম। রোববার আকবরকে মেঘালয়ের তিজাঙ্ঘা নামক স্থানে রহিম উদ্দিনের কাছে হস্তান্তর করে খাসিয়ারা।

রোববারই দুটি সাদা প্রাইভেটকারে দনা সীমান্ত এলাকায় আকবরকে আনা হয়। সেখানে রহিম উদ্দিনের তত্ত্বাবধানে খাসিয়াদের কাছেই থাকেন আকবর। ভারতের অভ্যন্তরে থাকাকালীনই কানাইঘাটের পুলিশকে বিষয়টি জানিয়ে রাখেন রহিম উদ্দিন। ভাইরাল হওয়া ভিডিও ফুটেজগুলোতে দেখা যায় এসআই আকবরকে মিষ্টির কার্টন বাধার প্লাস্টিকের রশি দিয়ে বেধে নিয়ে আসা হচ্ছে। তার সাথে ছিলেন রহিম উদ্দিন এবং খাসিয়া সম্প্রদায়ের লোকজন। এ সময় আকবরকে লাঠিপেটাও করে খাসিয়ারা। একটি ফুটেজে হিন্দি ভাষায় রায়হান হত্যার কথা স্বীকার করে আকবরকে খাসিয়াদের কাছে ক্রন্দনরত অবস্থায় নিজের প্রাণভিক্ষা চাইতেও দেখা যায়।

পালানোর পর কোম্পানীগঞ্জের মাঝেরগাঁও এলাকায় একটি বাড়িতে অবস্থান করার কথাও স্বীকার করেন আকবর। এ সময় আকবর তার উর্ধ্বতন কর্মকর্তার পরামর্শেই দুই মাসের জন্য দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন বলে জানান। ফুটেজগুলো রোববার ধারণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

আর ফুটেজ বিশ্লেষণে বুঝা গেছে আকবর ধরা পড়েছেন অন্তত আরও একদিন আগে। পেছনের আলাপে স্পষ্ট হওয়া গেছে আগের রাতেও তাদের হেফাজতেই ছিলেন আকবর। কেউ একজন বলছিলেন, আগের রাতে কিছু খাননি আকবর। মোবাইল ফোনে চার্জ না থাকায় রাতে যোগাযোগও করতে পারেননি তারা।

সোমবার সকালে আকবরকে নিয়ে দনা সীমান্তের ১৩৩৫ নম্বর পিলার অতিক্রম করে কানাইঘাট উপজেলায় প্রবেশ করেন রহিম উদ্দিন ও তার সহযোগীরা। খাসিয়ারা রয়ে যায় ওপারেই। আকবরকে নিয়ে আসার ব্যাপারটা জানা থাকায় পুলিশ সেখানে আগে থেকেই অবস্থান করছিলো। সীমান্ত এলাকা থেকে বাংলাদেশের অনেকটা ভেতরে আসার পর অপেক্ষমান কানাইঘাট থানা পুলিশের হাতে এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে হস্তান্তর করেন রহিম উদ্দিন।

কানাইঘাটে দুই ইউনিয়নবাসীর মধ্যে লাঠিসোটা নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনা আঁচ করে সকালেই সেখানে পৌছে গিয়েছিলেন সিলেটের পুলিশ সুপার। দুপুরে নদী পার করে কানাইঘাট থানায় নিয়ে আসা হয় আকবরকে।

বিকেল পৌণে ৪টায় কানাইঘাট থানা থেকে আকবরকে নিয়ে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন পুলিশ সুপার ফরিদ উদ্দিন। সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ সিলেটে পৌছান তিনি। প্রেসব্রিফিং শেষে রাত ৮টায় পিবিআই’র কাছে আকবরকে হস্তান্তর করে সিলেট জেলা পুলিশ।

১০ অক্টোবর দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে নগরীর কাষ্টঘরের সুলাই লালের ঘর থেকে যুবক রায়হান আহমদকে (৩২) আটক করে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে আসেন এএসআই আশেক এলাহী। রায়হান নগরীর নেহারীপাড়া এলাকার মৃত রফিকুল ইসলামে ছেলে।

ফাঁড়িতে নেওয়ার পর ছিনতাইয়ের অভিযোগ এনে রায়হানকে লাঠি দিয়ে বেধড়ক মারধর করেন ফাঁড়ি ইনচার্জ এসআই আকবর, এএসআই আশেক এলাহীসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য। প্রায় ৩ ঘন্টা পর ১১ অক্টোবর ভোরে গুরুতর আহত রায়হানকে সিএনজি অটোরিকশায় উঠিয়ে সিলেট এমএজি ওসমানী হাসপাতালে নেওয়া হয়।

রায়হান সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকের কাছে পানি খেতে চান। পানি খাওয়ার পরপরই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রায়হান। শুরুতে রায়হানের মৃত্যুর ঘটনাকে গণপিটুনি হিসেবে সাজাতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন আকবর। কিন্তু বিধিবাম, ১১ অক্টোবর বিকেলেই সত্য ঘটনা বেরিয়ে আসে। বন্দরবাজার ফাঁড়িতে পুলিশের নির্যাতনেই মারা গেছেন রায়হান, এ খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে গণমাধ্যমে।

শুরু হয়ে বিক্ষুদ্ধ জনতার আন্দোলন। আকবর তখন ঠান্ডা মাথায় ফন্দি আঁটেন নিজেকে বাঁচানোর। বন্দরবাজার ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যরা মুখ খুললে তাদের বুকে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করে দেবেন বলে হুমকি দেন এসআই আকবর। ওইদিন সন্ধ্যায় আকবর তার কথিত খালাতো ভাই কোম্পানীগঞ্জের বুরিডহর গ্রামের ইসারইল আলীর ছেলে আব্দুল্লাহ আল নোমানের মাধ্যমে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির সিসিটিভি ক্যামেরার হার্ডডিস্ক বদলে ফেলেন। এ কাজে নোমানকে সহায়তা করেন ফাঁড়ির টুআইসি এসআই হাসান উদ্দিন।

পরদিন ১২ অক্টোবর বিকেলে নোমানের সাথে সিলেট শহর ছাড়েন আকবর। বিকেলটা কোম্পানীগঞ্জ সদরে নোমানের বাসায় কাটিয়ে সন্ধ্যার পর আশ্রয় নেন উত্তর রণিখাই ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী মাঝেরগাঁও গ্রামে। আকবরকে সীমান্ত এলাকায় পৌছে দিয়ে নগরীতে ফিরে আসেন নোমান। আকবর মাঝেরগাঁও গ্রামেই একটি বাড়িতে ১২ ও ১৩ অক্টোবর রাত্রিযাপন করেন। ওই বাড়ির কর্তা-গিন্নিও আকবরকে নিরাপদে সীমান্ত পার করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

১৪ অক্টোবর ভোরে নোমানের বন্ধু কোম্পানীগঞ্জের বরমসিদ্ধিপুর গ্রামের আবদুল করিমের ছেলে হেলাল আহমদের মাধ্যমে উৎমা-বড়পুঞ্জি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের মেঘালয়ে পালিয়ে যান এসআই আকবর। মেঘালয়ে আকবরকে আশ্রয় দেন মণিপুরী যুবক নরেশ সিংহ। মূল বাড়ি কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার মাঝেরগাঁওয়ে হলেও, এক যুগেরও বেশি সময় ধরে মেঘালয়ে বসবাস করছেন নরেশ। পেশায় গাড়িচালক।

শিলং, গৌহাটি, শিলচর, চেরাপুঞ্জি, ডাউকি তথা আসাম ও মেঘালয়ে তার অবাধ যাতায়াত। সেই সুবাদে অর্থের বিনিময়ে এপার-ওপারে মানবপাঁচারও করেন নরেশ। তার সহায়তায় মেঘালয়েও একাধিকবার স্থান পরিবর্তন করেন আকবর। এক পানপুঞ্জি থেকে আরেক পানপুঞ্জি। এতে সহায়তা করেন গোপাল নামে আরো এক ভারতীয় নাগরিক।

এদিকে, ঘটনার পরপরই এসআই আকবরকে ধরতে এবং ঘটনার সত্যতা উদঘাটনের জন্য মাঠে নামে র‌্যাব, পিবিআইসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৭টি সংস্থা। আকবরের ভারতে প্রবেশের পর নগরীর হাউজিং এস্টেটের বাসা থেকে লাপাত্তা হন কোম্পানীগঞ্জের যুবক নোমানও। হার্ডডিস্কের সূত্র ধরে খুঁজতে গিয়ে চোরাচালানি হেলালের সাথে নোমানের যোগাযোগের প্রমাণ পায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

১৮ অক্টোবর সীমান্ত এলাকায় অবৈধভাবে পাথর চুরির একটি মামলায় হেলালকে বরমসিদ্ধিপুর থেকে গ্রেপ্তার করে সিলেট জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। পরদিন সিলেটের আদালতে হেলালের ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। এরই মধ্যে নোমানের বাবা, মা, স্ত্রী, মাঝেরগাঁও গ্রামের ব্যবসায়ী নাজমুল হক হেলাল, তার স্ত্রী সিলেট জেলা পরিষদের সদস্য তামান্না আক্তার হেনা, লাহিন মিয়া, শাহীন মিয়া, চোরাচালানী হেলালের সহযোগী তৈয়ব আলী, পুলিশের কথিত লাইনম্যান তোফায়েল, গরু চোরাচালানী নিজাম মিয়াসহ আরো কয়েকজনকে একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদ করে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর একাধিক টিম।

একপর্যায়ে নরেশ সিংহের সন্ধান পায় আইনশৃঙ্খলাবাহিনী। নরেশের কাছেই যে আকবর রয়েছে, সে ব্যাপারেও নিশ্চিত হন তারা। এরপর নরেশের সাথে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে আলাদাভাবে দেখা করেন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কর্তাব্যক্তিরা।