জয়িতাদের গল্প

এনামুল কবীর :: নারীর জন্য পৃথিবীটা এখনো যথেষ্ট কঠিন। বিশেষ করে তৃতীয় বিশে^র নারীদের এই একবিংশ শতাব্দিতে এসেও নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার নানা বাধা পেরিয়ে সফল নারীদের সম্মাননা জানাচ্ছেন বেশ কয়েক বছর ধরে। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালে সিলেট জেলা ও দক্ষিণ সুরমা থানায় জতিয়তা অন্বেষণে বাংলাদেশ শীর্ষক কার্যক্রমের আওতায় মোট ১০ জন সফল নারীকে সম্মাননা জানানো হচ্ছে। সিলেট জেলা থেকে এবার ৫ ক্যাটাগরিতে যারা জয়িতা সম্মাননা পাচ্ছেন তারা হলেন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সাফল্যের জন্য ফরিদা আক্তার চৌধুরী কুটি, শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনের জন্য অলকা রাণী দাশ মহালদার, সফল জননী হিসাবে মন্দিরা রাণী ভট্টাচার্য, নির্যাতনের বিভিষিকা মুছে নতুন উদ্যমে জীবন শুরুর জন্য রুকসানা আক্তার রিমি ও সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদানের জন্য ছোফিয়া বেগম।
এবার অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী হিসাবে জয়িতা সম্মাননার জন্য নির্বাচিত ফরিদা আক্তার চৌধুরীর জন্ম সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার গাভুরটিকা গ্রামে। পিতার নাম আব্দুল গফুর। চরম দরিদ্র পরিবারের ফরিদা বেগমের বিয়েও হয় আরেক দরিদ্র মানুষের সাথে। তবে সামান্য লেখাপড়া করা ফরিদা মোটেও দমে যাননি। একটি সন্তান জন্মের পর তার স্বামী মারা যান। এত প্রতিকূলতার মধ্যে সেলাই মেশিন কিনে নেমে পড়েন জীবন যুদ্ধে। সেই দরিদ্র ফরিদা এখন কোটিপতি। শহরে ও গ্রামে আছে তার ৪টি ব্যবসাত প্রতিষ্ঠান। এসব দিক বিবেচনা করে সরকারের মহিলা ও শিশু অধিদপ্তর সিলেট জেলার ২০১৯ সালের জন্য ফরিদা বেগমকেই জয়িতা সম্মাননার জন্য নির্বাচন করেছে।
গোলাপগঞ্জের ঢাকাদক্ষিণের দত্তরাইল মিশ্রপাড়ার সুমন তালুকদারের স্ত্রী অলকা রানী দাশ মহালদার। নি¤œবিত্ত পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন তিনিও। চতুর্থ শ্রেণীতে পড়াকালীন সময়েই মৃত্যুবরণ করেন তার বাবা। ৪ বোনের মধ্যে তৃতীয় অলকা খুব কষ্টে টিউশনি করে লেখাপড়ার খরচ যুগিয়েছেন। কঠোর সংগ্রামের মধ্যে তিনি ইংরেজী বিষয়ে কৃতিত্বের সাথে ¯œাতক ও ¯œাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। বিয়ের পর স্বামীর সহযোগীতায় তিনি বিসিএস পরীক্ষায় সফল হয়ে শিক্ষকতায় যোগ দেন। বর্তমানে অলকা সিলেটের এমসি কলেজের ইংরেজী বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।
মন্দিরা রানী ভট্টাচার্যের জন্ম সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার বাদেদেউলী গ্রামে। এসএসসি পাশের পর কিশোরী বয়সেই তার বিয়ে হয়। স্বামীর নাম রতন চক্রবর্তী। তিনি একজন দলিল লেখক। মোটামুটি সংসার ভালো চললেও হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে অচল হয়ে পড়েন তিনি। তার সাথে সাথে অচল হয়ে পড়ে সোনার সংসারও। এমন বিপর্যয়েও হাল ধরেন মন্দিরা। টিউশনির সাথে সাথে একটি বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করে অতি কষ্টে ছেলেদের লেখাপড়া চালিয়ে যেতে থাকেন। সেই সাথে স্বামীর ওষুধ, সংসারের চাকাও সচল রাখেন তিনি। বর্তমানে তার ৩ ছেলের একজন বাংলাদেশ রেলওয়ের উচ্চপদস্ত কর্মকর্তা, মেজো ছেলে সোনালী ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা ও ছোট ছেলে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। প্রতিকূল পরিবেশে সন্তানদের লেখা-পড়া শিখিয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে অবদান রাখায় এবার সরকার তাকে জেলা পর্যায়ে সফল জননী হিসাবে জয়িতা সম্মাননার জন্য নির্বাচন করেছে।
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের মেয়ে রুকসানা ইসলাম রিমি। পিতা দিন-মজুর সিরাজুল ইসলামের ৮ ছেলে-মেয়ের একজন তিনি। বসতভিটে বিক্রি করে তার বাবা তাদের দুই বোনকে বিয়ে দিয়েছিলেন অনেক আশা বুকে নিয়ে। কিন্তু রিমির জীবনে আর সুখ হয়নি। বিয়ের পরপরই স্বামী ও তার বাড়ির লোকজন তাকে যৌতুকের জন্য নির্যাতন করতে শুরু করে। অতিষ্ঠ হয়ে একাধিকবার স্বামীর বাড়ি ছেড়ে বাবার বাড়ি, আবার স্বামীর বাড়ি- এমনটা করার পর এক পর্যায়ে তার পক্ষে আর স্বামীর সংসারে থাকা সম্ভব হয়নি। নির্যাতনের বিভিষিকা বুকে নিয়ে ফিরে আসেন বাবার বাড়ি। সব দুঃখ-কষ্ট ঝেড়ে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করেন। একটি এনজিওতে চাকিরও জোগাড় করে ফেলেন। পাশাপাশি আবারও শুরু করেন লেখাপড়া। ইতিমধ্যেই তিনি ¯œাতক পাশ করেছেন। ২০১৯ সালের জন্য সরকার রিমিকেই জয়িতা সম্মাননা দিচ্ছেন নির্যাতনের বিভিষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরুর জন্য।
সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখায় ২০১৯ সালের জন্য জয়িতা সম্মাননা পাচ্ছেন গোলাপগঞ্জ পৌরসভার ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী সদস্য ছোফিয়া বেগম। তার বাড়ি ফুলবাড়ি ইউনিয়নে। অল্প বয়সে বাবাকে হারিয়ে চাচার কাছে মানুষ। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তার বিয়ে হয় বর্তমান পৌর এলাকার অইম আলীর সাথে। সংসারে অভাব খুব একটা না থাকলেও আরো স্বচ্ছলতার জন্য কয়েকটি এনজিওতে বিভিন্ন সময়ে কাজ করেছেন। দুর্দশাগ্রস্ত নারীদের সমস্যাগুলো দেখেছেন খুব কাছে থেকে। তাদের সমস্যা সমাধানে অবদান রাখার ইচ্ছায় ২০০৮ ও ২০১৫ সালে তিনি পৌরসভার ১,২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী সদস্য হিসাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন এবং সফল হন। তিনি গরিব দুঃখী অসহায় মানুষের পাশে থেকে কাজ করছেন। তাদের সমস্যায় নির্ভরশীলতার প্রতীক হিসাবে পাশে দাঁড়ান তিনি। আর তাই এবার সরকার তাকে সমাজ উন্নয়নে অবদান রাখায় জয়িতা সম্মাননা জানানোর জন্য নির্বাচন করেছেন।
দক্ষিণ সুরমা উপজেলা থেকে ২০১৯ সালের জন্য ৫ ক্যাটাগরিতে জয়িতা নির্বাচিত হয়েছেন যারা, তারা হলেন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী হিসাবে মোছাম্মত নেওয়ারুন নেছা, শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী হিসাবে শাহানা বেগম, সফল জননী নারী সাহিদা বেগম, নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু নারী সিাবে মনোয়ারা বেগম ও সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখায় মোছা. হোছনে আরা বেগম।