কপিরাইট: আগে আসলে আগে পাবেন!

একাত্তর ডেস্ক :: ধরুন আপনি একটি সফটওয়্যার বানিয়েছেন, বই লিখেছেন কিংবা লিখেছেন গান। কিন্তু সেই সৃষ্টির কপিরাইট আপনি নিয়ে রাখেননি। পরে আপনার লেখা গান কিংবা বইয়ের লেখার যদি অন্য কেউ কপিরাইট চেয়ে বসে তবে তিনিই সেটা পেয়ে যাবেন! আপনি মালিক হলেও নিজের কাজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে তখন আপনাকে যেতে হবে আইনি লড়াইয়ে। আর এসবই ঘটছে দেশে কপিরাইট নিবন্ধনের ক্ষেত্রে। কর্তৃপক্ষ বলছেন, কপিরাইট অফিসে ইতোমধ্যে নিবন্ধিত হয়নি এমন যেকোনও কিছুর কপিরাইট যদি কোনও ব্যক্তি চায় তাহলে নিয়ম ও পদ্ধতি মেনে তাকে দিয়ে দেওয়া হবে। ফার্স্ট কাম ফার্স্টস সার্ভ। বিষয়টি যাচাই-বাছাই না করেই ‘আগে আসলে আগে পাবেন’ ধরনের হয়ে যাচ্ছে কিনা প্রশ্নে কপিরাইট অফিস বলছে, শঙ্কা তো আছেই। কেননা, কেবল কপিরাইট নিবন্ধন করতে আগ্রহী ব্যক্তির অঙ্গীকারনামাকে বিশ্বাস করেই পুরো কাজটি করা হয়। নিবন্ধন চাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কোনও পক্ষ আপত্তি জানাচ্ছে কিনা তা দেখতে মাত্র ৩০ দিন অপেক্ষা করা হয়। মৌলিক সৃষ্টিকর্মের মালিকানা বা স্বত্বাধিকার নিশ্চিত করাই হচ্ছে কপিরাইট। সাহিত্য বা যেকোনও লেখা, শিল্পকর্ম, সংগীত, চলচ্চিত্র, স্থাপত্য নকশা, আলোকচিত্র, ভাস্কর্য, লেকচার, কম্পিউটার প্রোগ্রাম অর্থাৎ যা কিছু মৌলিক সৃষ্টি বলে গণ্য হবে, সেটাই কপিরাইটের অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে। কপিরাইট থাকলে বিনা অনুমতিতে সেগুলো ব্যবহার, পুনর্মুদ্রণ, অনুবাদ, প্রকাশ ইত্যাদি করা হলে তাতে আইনের আওতায় শাস্তি ও জরিমানা হতে পারে। সম্প্রতি কপিরাইট নিয়ে দুটি বিতর্ক বেশ আলোচিত। একটি হলো জনপ্রিয় স্পাই থ্রিলার সিরিজ মাসুদ রানার স্বত্বাধিকার ও আরেকটি হলো ‘যুবতী রাধে’ গানের কথা। জনমনে তাই প্রশ্ন আসে, চাইলেই কপিরাইট দিয়ে দেওয়া হয়? নাকি যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ আছে। জবাব দিতে গিয়ে কপিরাইট অফিসের রেজিস্ট্রার জাফর রাজা চৌধুরী বলেন, ‘যাচাই-বাছাই বলতে তেমন কিছু করা হয় না। যিনি কোনও কিছুর নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেন তাদের কাছে থেকে আমরা একটা অঙ্গীকারনামা নিই। যেখানে তিনি তার কাজটিকে মৌলিক বলে অবহিত করেন। সেটি মিথ্যা প্রমাণ হলে তার কী শাস্তি হবে সেটারও উল্লেখ থাকে। সেই আবেদনের কাগজের কপি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে আবেদনকারীই পাঠাবেন। এরপর ৩০ দিন অপেক্ষার পালা। এই বিষয়ে যদি আমাদের অফিসে আগে কোনও নিবন্ধন না হয়ে থাকে তাহলে কািইট দেওয়া হয়।’ কপিরাইট অফিস কোনও যাচাই না করে কেবল আবেদনকারীর আবেদনের ভিত্তিতে কপিরাইট দেওয়ার কারণেই বিতর্ক বেশি সৃষ্টি হচ্ছে কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘কেউ তো সিন্দুকে রাখার জন্য কপিরাইট নিচ্ছে না। এটা অবশ্যই জনসম্মুখে প্রচার করবেন এবং কারোর আপত্তি থাকলে তখন তা প্রকাশ হবে। প্রতিটি আবেদন তদন্ত করতে হলে প্রচুর সময় যাবে।’ উল্লেখ্য, বাংলাদেশে কপিরাইট আইন প্রথম তৈরি হয় ১৯৭৪ সালে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বিষয়বস্তু উপস্থাপনায় পরিবর্তন আসায় ২০০০ সালে নতুন একটি কপিরাইট আইন করা হয়, যা পরে ২০০৫ সালে সংশোধন হয়। ভাষাচিত্রের প্রকাশক খন্দকার সোহেল মনে করেন, সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন এবং আরও দায়িত্বশীল না হলে বাংলাদেশে কপিরাইট অফিস আসলে মেধাস্বত্বের কাজটি সঠিকভাবে করতে পারবে না। একটি বইয়ের কপিরাইট নেওয়ার পর যদি সেই বইয়ের নাম প্রচ্ছদ পাল্টে ভেতরের লেখা সামান্য এদিক-ওদিক করে নিবন্ধনের জন্য কেউ যায়, সেটি ধরতে পারার সামর্থ্য বা ৎুযুক্তি বর্তমান কপিরাইট অফিসের নেই। এমন পদ্ধতি থাকতে হবে যাতে যে কেউ কপিরাইট চাইলে টেকনোলজি ব্যবহার করে তা শনাক্ত করা যাবে যে কাজটি মৌলিক নাকি কপি করা। কেবল অঙ্গীকারনামা দিয়ে এ ধরনের নিবন্ধন করলে বিতর্ক ক্রমেই বাড়বে। বাংলাদেশে কপিরাইট আইন লঙ্ঘনে কী ধরনের শাস্তি আছে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানজিম আল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চলচ্চিত্র বাদে চারটি ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ চার বছরের জেল ও দুই লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান আছে। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে শাস্তির পরিমাণ পাঁচ বছর। তবে সেটি তখনই কেউ দাবি করতে পারবেন, যখন তার নামে চিত্রনাট্য নিবন্ধন করা থাকবে।’ এ বিষয়ে রেজিস্ট্রার জাফর রাজা চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আইনে প্রতিকার আছে। কিন্তু প্রতিকার পেতে হলে মেধাসম্পদটির অবশ্যই রেজিস্ট্রেশন থাকতে হবে। সকলে যেন তার সৃষ্টিকে নিবন্ধনের আওতায় আনে সেজন্য আমরা জোর প্রচার চালাচ্ছি। আমাদের ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি কোর্ট না থাকায় কপিরাইট বোর্ড কাজটি করে থাকে।’