বাইডেন এলেও বদলাবে না

বিশেষ প্রতিনিধি :: ডোনাল্ড ট্রাম্প না জো বাইডেন, নতুন প্রেসিডেন্ট যেই হোন, ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্ক নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। কারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে ঢাকা ঘুরে যাওয়া স্টিফেন বিগানের কূটনীতিটাই টিকে যাবে।
ট্রাস্পের বিশেষ দূত হিসেবে বিগান যা বলেছেন, সেটা বাইডেন প্রশাসন এসে উল্টে দেবেন, সেই প্রশ্ন নেই। তবে অনেকেই বলবেন, ঐতিহাসিকভাবে সম্পর্কটা ডেমোক্রাটদের সঙ্গেই আরো জমবে ভালো। তার কারণ ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলীয় পূর্বসূরী রিচার্ড নিক্সন ও তার সহযোগী হেনরি কিসিঞ্জরের কলংকিত ভূমিকা। তাদের ভুল নীতির কারণেই ওয়াশিংটন সেদিন ‘দি টিল্ট’ বা পাকিস্তানের দিকে ঝুকে পড়া নীতি গ্রহণ করেছিলেন। তবে রিপাবলিকানদের সেই ভুল নীতির বিরুদ্ধে যিনি রুখে দাড়িয়েছিলেন তিনি একজন এডওয়ার্ড কেনেডি। সিনেটর কেনেডি একাত্তরে কলকাতায় বাংলাদেশী উদ্বাস্তুুদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। বাংলাদেশের যুদ্ধে পাকিস্তানিদের অস্ত্র না দিতে বাইডেনের পূর্বসূরীরা প্রতিবাদে মুখর হয়েছিলেন। এমনকি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিয়োগান্তক হত্যাকাণ্ডের সময় নিক্সনের উত্তরসূরী রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড ক্ষমতায় ছিলেন। এবং তখন তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ছিলেন ড. কিসিঞ্জার। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুর খুনীদের আশ্রয়দানে রিপাবলিকানদের ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে কলংকিত ও বিতর্কিত হয়ে থাকবে। সিনেটর কেনেডিসহ অনেক ডেমোক্র্যাট রাজনীতিকদের প্রবল প্রতিবাদের মুখে কিসিঞ্জার সেদিন বঙ্গবন্ধুর খুনীদের আশ্রয় দিতে পারেননি।
তবে ধীরে ধীরে মার্কিনদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক সম্পর্কে পরিবর্তন এসেছে। অবশ্য এখানে ভারত ফ্যাক্টর রয়েছে। ভারতের সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গেই ভালো দহরম মহরম। তামিল নাড়–র গ্রামগুলোতে পর্যন্ত বাইডেনর রানিং মেট ভাইস প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী কামিলার ছবি গাছে গাছে টানিয়েছে। অবশ্য চীনকে রুখে দেওয়ার প্রশ্নে দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন নীতিতে সম্প্রতি যে পরিবর্তন এসেছে, তাকে বাইডেন স্বাগত জানাবেন, ধারাবাহিকতা বজায় রাখবেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মার্কিন উপপরাষ্ট্র মন্ত্রী স্টিফেন বিগানের সাম্প্রতিক সফরকে চীন ঈষৎ হলেও ভ্রু কুচকে তাকিয়েছে। অনেকের মতে ঢাকাকে কেন্দ্র করে জমে উঠেছে একধরনের ত্রিভুজ ক‚টনীতি। দিল্লি, চীন, ওয়াশিংটন সবাই পাশে চায় বাংলাদেশকে।
প্রশ্ন উঠেছে, ঢাকা কি তবে শেষপর্যন্ত ওয়াশিংটনের দিকেই ঝুঁকলো?
মার্কিন নির্বাচনকে পাশে সরিয়ে ওয়াশিংটন ব্যস্ত হয়ে পড়ল দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে। মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন বিগান ঢাকায় বলেছেন, ভারত প্রশান্ত মহাসাগরীয় কৌশল বা ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজিতে বাংলাদেশের সমর্থন চেয়েছে আমেরিকা। অবশ্য চীনের আগেই জানা ছিল যে, এই সমর্থন বাংলাদেশ প্রকাশ্যেই দিয়েছে আগেই। কারণ এই জোটে ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানও আছে। সেপ্টেম্বরে মার্কিন জ্বালানি এবং পরিবেশ বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি কিথ ক্র্যাচ আমেরিকান কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, ফার্মাসিটিক্যালস এবং কৃষি খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। গত ৩০ সেপ্টেম্বর এক ভার্চুয়াল সম্মেলনে তিনি ওই আহ্বান জানান। উল্লেখ্য যে, ঢাকা এবং ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাসে এই অগ্রগতিকেই সবথেকে উচ্চ পর্যায়ের বলে গণ্য করা হয়।
ঢাকা-ওয়াশিংটন সই হলো এভিয়েশন চুক্তি। সম্পূর্ন নতুন ঘটনা। আচমকা ঘটে গেল। অনেকে স্মরণ করছেন যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রথম আমলে (১৯৯৬-২০০১) ভারতের উদ্বেগ পাশ কাটিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে স্ট্যাটাস অব ফোর্সেস এগ্রিমেন্ট বা সোফা চুক্তি সই করেছিল। সেই সোফা কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার সবার সঙ্গে করতে চায় তারা। সবাই এতে রাজি হয়নি আজো।
এটা লক্ষণীয় যে, মার্কিন ওপেন স্কাই পলিসির আওতায় আকস্মিকভাবেই সই হলো ওই এভিয়েশন চুক্তি। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ফ্লাইট চলাচলের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই চুক্তিটি সই হয়েছে গত ৩০ সেপ্টেম্বরে। ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই নীতির আওতায় বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শক্তিশালী অর্থনৈতিক বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব, জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক উন্নয়ন এবং বিমান ও পর্যটন সংক্রান্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে নতুন সুযোগ এনে দেবে। উল্লেখ্য, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও গত মাসেই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সঙ্গে আলোচনা করতে চলে আসেন ভারতে। চলতি বছরের শেষ দিকে রয়েছে ইউএস-ইন্ডিয়া টু প্লাস টু মিনিস্ট্রিয়াল ডায়লগ। এর মানে দুইদেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রীরা বসবেন।
মি. বিগান ঢাকায় আসার আগে দিল্লিতে বলেছেন ‘পরিবর্তিত আবহাওয়া এবং স্রোতধারার পটভূমিতে কাজ করব।’ মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, ‘ভারত এবং সমভাবাপন্ন অংশীদারদের’ সঙ্গে কি করে ‘আঞ্চলিক নিরাপত্তা’ ও ‘অর্থনৈতিক সহযোগিতা’ গড়ে তোলা যায়, সেটাই হবে তাদের লক্ষ্য। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস বলেছে, ‘বাংলাদেশে মার্কিন উপ-পররাষ্ট্র মন্ত্রী ইন্দো-প্যাসিফিক রিজিয়নের জন্য নিরাপত্তা ও শান্তি নিয়ে কথা বলেছেন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এসপার অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে সফর করেন ভারত ছাড়াও শ্রীলংকা এবং মালদ্বীপ। এর নাম দেওয়া হয়েছে টু প্লাস টু। মানে একসঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এই অঞ্চলের বন্ধুদের সমকক্ষদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এবারে তারা বাংলাদেশে না এলেও তারা প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেহেতু যুগপৎ প্রতিরক্ষা মন্ত্রী তাই মি. পম্পেও এবং মি. এস্পার বাংলাদেশের পররাস্ট্র মন্ত্রী ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেছেন।
এটা তাৎপর্যপূর্ণ যে, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই সম্পর্কের ধারাবাহিকতা কিন্তু বাইডেন বা ট্রাম্প যেই থাকুন, বদলে যাবে না। মনে করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র আগে ভাবতো ভারতের প্রতিবেশীদের বিষয়টি তারা কেবল দিল্লির সঙ্গেই বোঝাপাড়া করে নেবে। কিন্তু ট্রাস্প এই নীতি ইতিমধ্যে বদলে ফেলেছেন। ভারতের চোখ দিয়ে আর বাংলাদেশ দেখবে না তারা। বাইডেন এলেও এই বিরাট ক‚টনৈতিক পরিবর্তনের কোনো অন্যথা হবে না। এমনকি ট্রাম্প প্রশাসন বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও আগের নিরবতা ভেঙ্গেছেন। এই ধারাও বজায় থাকবে।
অবশ্য বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত সম্প্রতি চীনা সরকারি মুখপত্র গেøাবাল টাইমসকে বলেছেন, মার্কিনরা যেভাবে বাংলাদেশের উচ্চ পর্যায়ে ঘন ঘন কথাবার্তা বলছে, তাতে পরিষ্কার যে, তারা ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কে চিড় ধরাতে চাইছে। এই মন্তব্যের বিষয়ে বাংলাদেশের কোনো মন্তব্য এখনও জানা যায়নি।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী এম এ মোমেন তাই বলেছেন, মার্কিন নির্বাচনে যেই আসুন বাংলাদেশের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। তিনি বুধবার ঢাকায় ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, নির্বাচনের ফলাফলের কোনো প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা না থাকায় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় ধারাবাহিকতার ব্যাপারে তারা আশাবাদী।