আসামে মিয়াঁ মিউজিয়াম ঝড়

বিশেষ প্রতিনিধি
‘মিয়াঁ মিউজিয়াম’ (বাংলাভাষীদের সংস্কৃতি সুরক্ষায়) এবং ‘বাঙালি মিউজিয়াম’ প্রতিষ্ঠার বিরোধীতায় আসামে ঝড় বইছে। এর আড়ালে রয়েছে অনেকের মতে বিজেপির বাংলাদেশী বিদ্বেষ।
মিয়াঁ যাদুঘর নির্মাণে গত ১৮ অক্টোবর রাজ্য সরকারকে চিঠি দিয়েছিলেন আসামের মুসলিম বিধায়ক শেরমান আলী আহমেদ। শেরমানের লেখা সেই চিঠি আসামের অর্থ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রী ড. হেমন্তবিশ্ব শর্মা তার টুইটারে প্রকাশ করেছেন। লক্ষ্য ছিল শেরমানকে হেনস্থা করা। হিমন্ত আপাতত সফল হয়েছেন। তিনি নতুন করে বাংলাদেশী বিদ্বেষ উসকে দিতে সক্ষম হয়েছেন। রাজ্য সরকার শেরমানের প্রস্তাব নাকচ করেছেন।
এরপর গত পরশু সিলেট সীমান্ত সংলগ্ন উত্তর করিমগঞ্জ থেকে নির্বাচিত কংগ্রেস বিধায়ক কমলাক্ষ দেবপুরকায়স্থ ‘বাঙালি মিউজিয়াম’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন। এটা শুনেও তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছেন ড. হিমন্ত বিশ্ব। এবং তা নাকচ করেছে বিজেপির রাজ্য সরকার।
এই বিতর্কে এসেছেন আজান পীর। কারণ তিনি সুফি সংস্কৃতির সমর্থক। ড. হেমন্ত বলেছেন, আজান পীরকে মানা আর মিঞা কালচার মানা এক নয়। এভাবেই আসামের চলতি সপ্তাহের রাজনীতিতে ঝড় চলছে।
হেমন্ত বিশ্ব শর্মা আসামের বিজেপি সরকারের সব থেকে প্রভাবশালী মন্ত্রী। ২৪ অক্টোবরের সন্ধ্যায় তিনি তার টুইটারে ওই চিঠি প্রকাশ করেন। এর সঙ্গে ইংরেজিতে লেখা তার মন্তব্য: ‘আমার বিবেচনায় আসামের চর অঞ্চলের কোনো আলাদা পরিচিতি নেই। কারণ এর অধিকাংশ মানুষ বাংলাদেশ থেকে এসেছে। শ্রীমন্ত শঙ্করাদেব কলাক্ষেত্র, এসবই আসামের মূল কালচার। আমরা এখানে কোনো বিকৃতি আনব না। দুঃখিত এমএলএ সাহেব।’
সেই থেকে প্রস্তাবিত ‘মিঁয়া মিউজিয়াম’ তর্কবিতর্কে চলমান। জাতিগত, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বে এমনিতেই সংঘাত। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আসাম রাজ্যে এবার বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে এই মিউজিয়াম। নির্বাচন আসন্ন। তাই ভোটের রাজনীতির সঙ্গে এর যোগ থাকবেই।
‘কলাক্ষেত্র’ নামে পরিচিত নির্বাচনী কেন্দ্রটিতে রাজ্যের চরাঞ্চল বা চর-চাপোরির বাসিন্দাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি মুখ্য। সেই অনুরোধ জানিয়ে রাজ্য সরকারকে একটি চিঠি লেখেন নিম্ন আসামের বাঘবার আসনের এমএলএ শেরমান আলি আহমেদ।
রাজ্য সরকার বলছে, শঙ্করদেব কলাক্ষেত্রে কোনও ‘মিঁয়া মিউজিয়ামে’র জায়গা হবে না। কারণ আসাম সরকারের সুষ্পষ্ট নীতি হল এই কলাক্ষেত্রে মিঁয়া মিউজিয়াম বা এই ধরণের অন্য কোনও সংগ্রহশালাই স্থাপন করা যাবে না। সরকারের সংগ্রহশালা বা অন্য কোনও বিভাগ যে কোনও মিঁয়া মিউজিয়াম গড়তে পারবে না, সে ব্যাপারে আমরা আপসবিহীন অবস্থান নিয়েছি।’
বিবিসির রিপোর্টে বলা হয়, আসামে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নদীদ্বীপ বা চরাঞ্চলে যে বাংলাভাষী মুসলিমরা বসবাস করেন, তাদেরই ‘মিঁয়া’ বলে অভিহিত করা হয় এবং ওই জাতিগোষ্ঠীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যেই ওই সংগ্রহশালা গড়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল।
রাজ্যের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটি প্রস্তাবটি প্রাথমিকভাবে অনুমোদন করেছিল। আসাম সরকার এখন জানালো আসামের চরাঞ্চলে আলাদা কোনও সংস্কৃতি আছে বলে তারা বিশ্বাস করে না। আর তাই রাজধানী গৌহাটিতে ‘মিঁয়া মিউজিয়াম’ গড়ারও প্রশ্ন ওঠে না।
এখানে উল্লেখ্য, আসামে নব্য-বৈষ্ণববাদী সংস্কারের রূপকার হিসেবে গণ্য করা হয় শ্রীমন্ত শঙ্করদেবের নামাঙ্কিত একটি সুবিশাল সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। সেভাবেই গড়ে তোলা হচ্ছে রাজধানী গৌহাটি। এর ঘোষিত লক্ষ্যই হল: ‘আসামের মানুষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণ ও প্রসার’।