বাছুলের হাতে জিম্মি জকিগঞ্জের প্রশাসন

স্টাফ রিপোর্ট
জকিগঞ্জ উপজেলার মানিকপুর ইউনিয়নের খাসেরা গ্রাম। সিলেট শহর থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরত্বে জকিগঞ্জের কালিগঞ্জ বাজার সংলগ্ন খাসেরা গ্রামটিতে বসবাস এক ত্রাস জাগানো পরিবারের। খাসেরা তথা পুরো জকিগঞ্জজুড়ে রয়েছে এ গ্রামের খ্যাতি। মদ, গাঁজাসহ বিভিন্ন ধরণের মাদকের ব্যবসা এবং চুরি-ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপকর্মের সাথে জড়িত এই পরিবারের পুরুষ সদস্যরা। একাধিক অভিযোগ থাকলেও তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনীহা। এর পেছনের কারণ খুঁজতে গিয়ে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে নানা অজানা তথ্য।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জকিগঞ্জের খাসেরা গ্রামের মৃত আব্দুল জলিলের পাঁচ ছেলে ওই এলাকার ত্রাস হয়ে বসে আছেন। বাবুল আহমদ (৫০), আব্দুল বাছিত বাছুল (৪৮), কামাল আহমদ (৪৫), আব্দুল আলীম মজু (৪৪) ও কালা আহমদ (৪২)। এই পাঁচ ভাইয়ের নামে কাঁপে খাসেরা গ্রাম। ভয়ে মুখ খোলার নেই কারো। তাদের কাছে জিম্মি জকিগঞ্জের প্রশাসনও। ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, জুয়া খেলা, মদ-গাঁজাসহ বিভিন্ন ধরণের মাদক ব্যবসা, ভারতীয় পণ্য চোরাচালানসহ এমন কোনো অপকর্ম নেই, যার সাথে এই পরিবারের সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা নেই। তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে মামলার লম্বা তালিকা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে বেশ কয়েকবার ধরাও পড়েছে তারা। কিন্তু ছাড়া পেয়েই আবার ফিরে গেছে আগের পেশায়। তাদের পেছনে রয়েছেন স্থানীয় কয়েকজন রাজনীতিক এবং সাংবাদিক। মূলত, তাদের মদদেই এমন অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন বাছুল ও তার ভাইয়েরা, এমনটাই জানা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খাসেরা গ্রামে এই পরিবার কয়েকবছর ধরে ডাকাতি, জুয়াখেলা, মদ-গাজা বিক্রয়, ভারতীয় চোরাচালানসহ বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের খপ্পরে পরে বিপথগামী হচ্ছে এলাকার যুবসমাজ। তাদের এসব কাজে এলাকাবাসী বাধা দিলে তারা বিভিন্ন ধরনের হুমকি প্রদান করে। তাদের ভয়ে এলাকার লোকজন কিছু বলতে পারে না। এ সুযোগে তারা নিদ্বিধায় এসব অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে থানায় একাধিক মাদক চোরাচালান, বিক্রি, ডাকাতি ও নারী ধর্ষণের মামলা রয়েছে। ৫ ভাইয়ের অসামাজিক কর্মকান্ডে অতিষ্ঠ হয়ে ২০১৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সিলেটের পুলিশ সুপার বরাবরে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন মানিকপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য ও খাসেরা গ্রামের বাসিন্দা বুরহান উদ্দিন। লিখিত অভিযোগে মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে আইনী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবী জানান এলাকাবাসী।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পরিবারের হর্তাকর্তা হলেন মৃত আব্দুল জলিলের মেঝ ছেলে আব্দুল বাছিত বাছুল। তার বিরুদ্ধে সিলেটের বিভিন্ন থানায় মাদক, ডাকাতি, ডাকাতির প্রস্তুতি, পুলিশ এ্যাসল্টসহ মামলা রয়েছে মোট ৫টি। ২০০৮ সালের ২২ জানুয়ারি বাছুলের বিরুদ্ধে জকিগঞ্জ থানায় দায়ের হয় ডাকাতি চেষ্টার মামলা (নম্বর ১৪)। ২০১৩ সালের ২৩ জুন সরকারি কাজে বাধা ও পুলিশের উপর হামলার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে জকিগঞ্জ থানায় আরো একটি মামলা (নম্বর-১৭) দায়ের করা হয়। ২০১৭ সালের ২৪ এপ্রিল গোলাপগঞ্জ থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে আরেকটি মামলা (নম্বর-৭) রুজ্জু হয় বাছুলের বিরুদ্ধে। ২০১৯ সালের ১১ ও ১৩ সেপ্টেম্বর মাত্র একদিনের ব্যবধানে বাছুলের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় দুটি মামলা (নম্বর-১৬ ও ১৭)। এর মধ্যে একটি ডাকাতি মামলায় ফৌজদারী কর্যবিধির ১৬৪ ধারার আসামি তিনি। এছাড়া আব্দুল বাছিত বাছুল জকিগঞ্জের শীর্ষ জুয়াড়ি হিসেবেও পরিচিত। তার বাড়ির সামনের মুদি মালের দোকানের আড়ালে জুয়া ও মদের আসর নৈমত্তিক বসে বলে জানান খাসেরা গ্রামের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি।
বাছুলের ভাই আব্দুল আলীম মজুর বিরুদ্ধে ডাকাতি, চুরি, মাদক ও ধর্ষণসহ মোট ১১ মামলা রয়েছে জকিগঞ্জ থানায়। এর মধ্যে ৬টি মামলাই ডাকাতির, ৩টি মামলা চুরির এবং বাকি মামলাগুলো ধর্ষণ, ডাকাতির প্রস্তুুতি এবং মাদকের। ২০১৮ সালের ১৯ মে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে জকিগঞ্জ থানায় দায়েরকৃত একটি মামলায় গত ১৮ ফেব্রæয়ারি মজুকে গ্রেপ্তার করে জকিগঞ্জ থানা পুলিশ। বর্তমানে তিনি করাগারে রয়েছেন।
বাছুলের বড়ভাই বাবুলের বিরুদ্ধে সিলেটের বিয়ানীবাজার ও জকিগঞ্জ থানায় রয়েছে ৫টি মামলা। সবগুলো মামলাই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দায়েরকৃত। আরেক ভাই কামাল আহমদের বিরুদ্ধেও গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার থানায় ৩টি মাদকের মামলা রয়েছে।
মানিকপুর ইউনিয়ন পরিষদের এক সাবেক সদস্য জানান, বাছুলের পুরো পরিবারটাই মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত। তাদের মধ্যে সবচেয়ে চালু হল বাছুল। সে সবকিছুর নিয়ন্ত্রক। মদ ও জুয়ার কারণে খাসেরা গ্রামের যুবসমাজ ধ্বংসের পথে মদ জুয়ার কারণে খাসেরা গ্রামের যুবসমাজ ধ্বংসের পথে ধাবিত হওয়ায় ২০১৭ সালে তাদের বিরুদ্ধে আমরা খাসেরা গ্রামের জনগণ সিলেটের পুলিশ সুপারের বরাবরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলাম। অভিযোগ দায়েরের পর তিনটি মাদক মামলা দায়ের হলেও মদ গাঁজার রমরমা ব্যবসা চলছে। জকিগঞ্জের পুলিশও মনেহয় তাদের নিয়ন্ত্রণে। নইলে এত মামলা থাকা স্বত্বেও অবাধে মাদক ব্যবসা তারা কিভাবে চালিয়ে যায়? আমরা সাধারণ জনগণ মুখ খুললে বাছুলের বাহিনী আমাদের বাড়িঘরে হামলা চালায় এবং নানাভাবে হয়রানী করে। খাসেরা গ্রামের শান্তিপ্রিয় মানুষেরা তাই নিজের মুখ বন্ধ রাখেন ভয়ে।
এ ব্যাপারে কথা হয় জকিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর মোহাম্মদ আব্দুন নাসেরের সাথে। তিনি একাত্তরের কথাকে জানালেন নিজের অসহায়ত্বের কথা। এর আগে বাছুলকেও গ্রেপ্তার করেছিলাম। গ্রেপ্তারের পর বাছুলের স্ত্রী সিলেটের পুলিশ সুপার মহোদয়সহ বিভিন্ন উর্ধ্বতন দপ্তরে আমার এবং জকিগঞ্জ থানা পুলিশের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন। আব্দুল বাছিত বাছুল নিজেও জেল থেকে বের হয়ে আমার বিরুদ্ধে পুলিশ হেডকোয়ার্টারসহ বিভিন্ন দপ্তরে অন্তত ডজনখানেক অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগগুলো বর্তমানে তদন্তাধীন। বাছুল ও তার পরিবারের কারো বিরুদ্ধে থানায় একটা মামলা দায়ের হলেও সে পুলিশের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করে। সর্বশেষ সে অভিযোগ দায়ের করেছে আমি নাকি তাকে হুমকি ধমকি দিচ্ছি। তার অতীতের অভিযোগের কারণে আমাকে দুয়েকদিন পরপরই উর্ধ্বতন মহলের কাছে জবাবদিহি এবং হাজিরা দিচ্ছে। আপনিই বলেন, একজন মাদক ব্যবসায়ী, যার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। তাকে গ্রেপ্তার করায় পুলিশকে উল্টো হয়রানীর শিকার হতে হচ্ছে। বাছুলের সাথে পুলিশের আঁতাঁতের বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমরা মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। কিন্তু, তার দায়েরকৃত ভিত্তিহীন অভিযোগগুলোর কারণে আমরা হয়রানির শিকার হচ্ছি।