নিশানায় আকবর: আতঙ্ক বরমসিদ্ধিপুরে

বিশেষ প্রতিনিধি
এক, দুই, তিন-গুনে গুনে বিশ দিন। সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনে রায়হান আহমদ নামের যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় মূল অভিযুক্ত পুলিশের এএসআই আকবর হোসেন ভুইয়া এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন। রায়হানের পরিবার কান পেতে আছে আকবরের ধরা পরার খবর শোনার অপেক্ষায়। অপেক্ষার একেকটি প্রহর তাদের কাছে বছরের চেয়েও দীর্ঘ। তাদের প্রতীক্ষা আর ফুরোচ্ছেই না।

রায়হান হত্যা মামলাটি মূলত: পিবিআই তদন্ত করলেও ছায়া তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে আইন প্রয়োগকারী সবগুলো সংস্থাই। সকলেই আকবরের সন্ধান-তালাশে ব্যস্ত। মাঝেমধ্যে আশ্বাস মেলে ‘আকবরকে ধরা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।’ তবে বিভিন্ন কর্মকান্ডে প্রতিয়মান হয় যে আকবর দেশে না ভারতে এনিয়ে আইন প্রয়োগকারি সংস্থাগুলোও আছে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের খবরে মোটামুটি নিশ্চিত করা হয়েছে আকবর ভারতে পালিয়ে গেছেন।

গণমাধ্যমে আকবরের সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের উৎমা-বড়পুঞ্জি সীমান্ত দিয়ে ভারত পালানোর সংবাদটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোও উড়িয়ে দিচ্ছেন না। আর তাই কোম্পানীগঞ্জের উৎমা-বড়পুঞ্জি সীমান্তঘেঁষা বরমসিদ্ধিপুর গ্রামে হঠাৎ করেই অপরিচিত লোকজনের আনাগোনা লক্ষ্য করছেন স্থানীয়রা। এই অপরিচিতরা যে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য তা তারা ঠিকই আন্দাজ করে নিয়েছেন। এ গ্রামের মানুষ আইনশৃংখলা বাহিনীর এতো আনাগোনা আগে কখনোই দেখেননি। তাই ভয়ে চুপসে গেছেন গ্রামের আবাল-বৃদ্ধ। কার্তিকের সন্ধ্যা যেন সবার আগেই নেমে আসে বরমসিদ্ধিপুর গ্রামে। ভয়ের অনেক কারণও আছে। গণমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে তাদেরও অজানা নেই বন্দরবাজার ফাঁড়ি থেকে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংরক্ষিত হার্ডডিস্ক পরিবর্তনকারী আকবরের বন্ধু আবদুল্লাাহ আল নোমানের সাথে যোগসূত্রের কারণে ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার হয়েছেন এ গ্রামেরই প্রভাবশালী চোরাকারবারি হেলাল আহমদ। রিমান্ডে নিয়েও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এছাড়াও আইনশৃংখলা বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখী হয়েছেন বরমসিদ্ধিপুর ও মাঝেরগাঁও গ্রামের বাসিন্দা জেলা পরিষদের সদস্য হেনা, তার স্বামী, এলাকার শাহীন মিয়া, লাহিন মিয়া, তৈয়ব আলীসহ অনেকে।

রায়হান হত্যার পর সাতজন পুলিশ সদস্যকে সাসপেন্ড ও ক্লোজ করলেও এদের মধ্যে থেকে আকবর পালিয়ে গেলে অস্বস্তিতে পড়ে পুলিশ। অবশিষ্ট ছয়জনের মধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। নতুন করে সাসপেন্ড করা হয় আরও এক এএসআইকে। এরই মাঝে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) শীর্ষ পদেও পরিবর্তন ঘটে।

নিশারুল আরিফ। সিলেটের নতুন পুলিশ কমিশনার হিসেবে যিনি ২৭ অক্টোবর সিলেট মেট্রোপলিটান পুলিশে যোগদান করেছেন। সংবাদমাধ্যম বলছে, রায়হান হত্যা রহস্য উন্মোচনের বিশেষ দায়িত্ব দিয়েই তাকে সিলেট পাঠানো হয়েছে। সিলেটে নেমেই তিনি হযরত শাহজালালের (রাহ.) মাজার জিয়ারত শেষেই তার বিশেষ দায়িত্বের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে নিহত রায়হানের বাড়িতে যান। সেখানে তিনি দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেছেন, যারাই এ হত্যা ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট থাকবে কেউই ছাড় পাবে না। নবনিযুক্ত পুলিশ কমিশনারের এ ঘোষণা আশার সঞ্চার করবে সন্দেহ নেই।

নিজেদের বাহিনীর সদস্য চোখের সামনে দিয়ে হাওয়া হয়ে গেছে এ যেন বিরাট এক অস্বস্থিতে ফেলেছে গোটা পুলিশ বাহিনীকে। তাই তারা যেকোনো মূল্যে আকবরকে চান। আর আকবরকে খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে আসে সিসি ক্যামেরার হার্ডডিস্ক গায়েব হওয়ার ঘটনা। বেরিয়ে আসে কুশীলব হিসেবে আকবরের বন্ধু কোম্পানীগঞ্জের আব্দুল্লাহ আল নোমান নামে এক যুবকের নাম। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মনে করছেন নোমান বা হার্ডডিস্ক যেকোনো একটার নাগাল পেলেই তারা হয়তো তীরে ভিড়তে পারবেন।

পুলিশ জনগণের বন্ধু এসব আপ্তবাক্য সভা সমাবেশে বা শ্লোগানে শোনা যায়। বাস্তবতা হচ্ছে এই উপমহাদেশে পুলিশ মানুষের প্রকৃত বন্ধু হয়ে উঠতে পারেনি। আর এ কারণেই হয়তো মানুষ বিশ্বাস করে ‘পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ ঘা’। রায়হান খুনের ঘটনা কেন, অন্য যেকোনো ঘটনা-দুর্ঘটনায় পুলিশ কি সাধারণের সাহায্য চেয়েছে। সাধারণ মানুষ যেখানে গেছে নিজের বিবেকের তাড়ায় গেছে। লঞ্চ, ট্রেন দুর্ঘটনা এসবের উদাহরণ। আকবর নিখোঁজ হওয়ার সাথে সাথে পুলিশ মানুষের সাহায্য চাইলে আকবর দেশ ছেড়ে পালাতে পারতেন না হয়তো।

রায়হান হত্যা ঘটনার তদন্ত এখন কোন পর্যায়ে বা কি কর্মকৌশল (অতি গোপন কিছু বাদে) কিছুই সাধারণ মানুষ জানতে পারছেন না। আকবর দেশে আছে না বিদেশে পালিয়ে গেছে এর কিছুই পুলিশের তরফ থেকে জনসাধারণের জানার জন্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে গুজব ডাল-পালা ছড়ায়। ঢাকায় বিভিন্ন ঘটনায় পুলিশ/র‌্যাবের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের ব্রিফ করা হয়, জানানো হয় ঘটনার সর্বশেষ অবস্থা। কিন্তু সিলেটে এটা কদাচিৎ ঘটে। এখানে তথ্যের বিরাট টানাপোড়নে পড়তে হয় সাংবাদিকদের। এসএমপিতে মিডিয়ার দায়িত্বে আছেন একজন কর্মকর্তা। কিন্তু তিনি মুখ খুলেন না। নবনিযুক্ত পুলিশ কমিশনার যেনো এ বিষয়ে উদ্যোগ নেন। অন্তত বড় ঘটনা-দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে প্রতিদিন একবার (ক্ষেত্র বিশেষে একাধিকবার) প্রেস ব্রিফিংয়ের ব্যবস্থা থাকলে কানা-ঘুষা থাকবেনা, ফেসবুকের পাতা ভরবে না আজগুবি গল্পে।

এসএমপি’র এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ২৯ অক্টোবর রায়হানের শিশু পুত্রের জন্য উপহার সামগ্রী পাঠিয়েছেন নব নিযুক্ত পুলিশ কমিশনার নিশারুল আরিফ। রায়হান পরিবারের জন্যে বিষয়টি আনন্দের সন্দেহ নেই, তবে এই উপহার সামগ্রীর বদলে আকবর গ্রেপ্তারের খবর যদি কমিশনার মহোদয় দিতে পারতেন সেটা শুধু রায়হানের পরিবার নয়, দেশবাসীর জন্য হতো আরও বড় উপহার এবং পুলিশের জন্যও স্বস্তিদায়ক।