উন্নয়ন প্রকল্পের নামে ‘হরিলুট’

দোয়ারাবাজার প্রতিনিধি
কাগজে পত্রে নামে-বেনামে প্রকল্পের বরাদ্দ পাওয়া গেলেও সরেজমিনে গিয়ে দৃশ্যমান কাজের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। এযেন কাজীর গরু কেতাবে আছে গোয়ালে নেই প্রবাদের মতোই দশা। কাজে হাত না দিয়েই প্রকল্পের পুরো টাকা ইতোমধ্যে উত্তোলন করে ফেলা হয়েছে। এমন নামেও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে অনুসন্ধান করে এই নামে এলাকায় কাউকেই পাওয়া যায়নি, কাউকে চেনেন না এলাকার লোকজনও। আবার অনেকে জানতেনইনা তাদের নামে যে বরাদ্দ আছে! এমনটিই হয়েছে সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের বরাদ্দে। সরেজমিনে অনুসন্ধানে গিয়ে ভুক্তভোগীদের বক্তব্যে বরাদ্দকৃত বিভিন্ন প্রকল্পের কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। বেশিকিছু প্রকল্পের তালিকার স্কিমের নামের সাথে কাজের কোনো মিল পাওয়া যায়নি। এখানে রয়েছে হেরফের। প্রকল্পের সভাপতি ও উপজেলা পিআইয়ো অফিসের যোগসাজশে এমনটি হয়েছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
সুরমা ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডের বৈঠাখাই গ্রামের মৃত আব্দুল হাসিমের ছেলে রহমত আলীর বাড়ির সামনে মটর, ট্যাংকিসহ গভীর নলকূপ স্থাপন বাবদ ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে এলজিএসপি প্রকল্পের আওতায় ২ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সরেজমিনে রহমত আলীর বাড়িতে প্রকল্পের কাজ পরিদর্শনে গিয়ে টিউবওয়েল, মটর ও ট্যাংকির কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। কাজের নির্ধারিত সময়সীমাও পেরিয়ে গেছে। কাগজেপত্রে কাজ দেখিয়ে এই নামের বরাদ্দের টাকাও ইতোমধ্যে উত্তোলন করা হয়ে গেছে। রহমত আলী তারাবান বিবি প্রতিবেদককে জানান, আমরা এসবের কিছুই পাইনি, কিছুই জানিনা। আমাদের বাড়িতে যে এসব বরাদ্দ আসছে তাও আমরা জানিনা।
০৫ নং ওয়ার্ডের টেংরাটিলার অকিল উদ্দিন আহাম্মদ পিতা মৃত আজিজুর রহমানের বাড়ির সামনে একটি গভীর নলকূপ, মটর ও ট্যাংকিসহ ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কাজ দেখিয়ে এই বরাদ্দের টাকাও উত্তোলন করা হয়েছে। কিন্তু সরেজমিনে অনুসন্ধানে গিয়ে, বরাদ্দের স্কিমে উল্লিখিত নাম অনুযায়ী মৃত আজিজুর রহমানের ছেলে অকিল উদ্দিন আহাম্মদ নামে এলাকায় কাউকেই পাওয়া যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই নামে এলাকায় কেউ নেই। বেনামে এই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
২০১৭-১৮ অর্থ বছরে একই ওয়ার্ডের টেংরা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের আসবাবপত্র ক্রয়ে এলজিএসসি প্রকল্পের আওতায় ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই বরাদ্দের নির্ধারিত কাজের সময়সীমা পেরিয়ে গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে এই বরাাদ্দ থেকে এখনোব্দি কোনো ধরনের আসবাবপত্র পায়নি টেংরা মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এ প্রসঙ্গে মোবাইলে জানতে চাইলে টেংরা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম জানান, আসবাবপত্র ক্রয়ে ৫০ হাজার টাকার একটা বরাদ্দ এসেছিল জানি কিন্তু স্কুলে এই বরাদ্দ থেকে কোনো ধরনের আসবাবপত্র ক্রয় করা হয়নি। এটা এখন কোন পর্যায়ে আছে তাও জানিনা।
২০১৮-১৯ অর্থবছরে ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডের বৈঠাখাই কমিউনিটি ক্লিনিক ও ৮নং ওয়ার্ডের মহব্বতপুর স্মৃতি দীপ্তিমান’র উন্নয়ন কাজে ৫ টন টিআর বরাদ্দ দেওয়া হয়। টিআর বরাদ্দের পুরোটাই ইতোমধ্যে উত্তোলন করা হয়ে গেছে কাগজে পত্রে কাজ দেখিয়ে। সরেজমিনে গিয়ে, দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন কাজ পাওয়া যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই পর্যন্ত এখানে কোনো উন্নয়ন কাজ হতে দেখা যায়নি। যোগাযোগ করা হলে বৈঠাখাই কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি নজরুল ইসলাম প্রতিবেদককে জানান, বরাদ্দের বিষয়ে আমি কিছুই জানিনা। ৭ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল কাদির জানান, এবিষয়ে আমারও কিছু জানা নেই, ইউপি চেয়ারম্যান ভালো বলতে পারবেন। ৫ নং ইউপি সদস্য আলতাব হোসেন জানান, মহব্বতপুর স্মৃতি দীপ্তিমানে উন্নয়ন কাজ হয়েছে কিনা আমি জানিনা।
২০১৯-২০ অর্থবছরে ইউনিয়নের আলীপুর আসক আলীর দোকান থেকে টিলাগাঁও রবিউলের দোকান পর্যন্ত সিবিআরএমপির ব্লকের রাস্তা মেরামতের জন্য ৫ দশমিক ৩৬ টন টিআর বরাদ্দ দেয় সরকার। এই বরাদ্দও উত্তোলন করে ফেলা হয়েছে কিন্ত এখনোব্দি এই রাস্তা মেরামতের কাজে হাত দেওয়া হয়নি। সরেজমিনে গিয়ে পুরো রাস্তা ঘুরে কোথাও রাস্তা মেরামত কাজ চোখে পড়েনি। মেরামতের অভাবে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে এই রাস্তাটি বেহাল অবস্থায় পড়ে আছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি সংরক্ষিত ইউপি সদস্য জরিনা বেগম এবং কাজ তদারকি করেছে উপজেলা পিআইয়ো অফিস। স্থানীয় বাসিন্দা আসক আলী প্রতিবেদককে জানান, রাস্তা মেরামতের নামে যে বরাদ্দ আসছে এই প্রথম জানলাম। আমি এই রাস্তার কোনো মেরামত কাজ হতে দেখিনি। রাস্তার পার্শ্ববর্তী বাড়ির বাসিন্দা টেংরাটিলার ডা. হানিফ প্রতিবেদককে জানান, সবসময় এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করি। রাস্তা নির্মাণের পর থেকে আজোবধি এই দীর্ঘ কয়েক বছরেও আমার জানা মতে এই রাস্তা মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। উপরন্তু এই রাস্তার শের মাহমুদ ভুঁইয়ার টিলার সন্নিকটের কালভার্টের অংশে এলাকার বিভিন্ন মানুষের ব্যক্তিগত আর্থিক সহায়তায় ও আলীপুরের মশিউর রহমান মাস্টারের উদ্যোগে মেরামত করা হয়েছে। এই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ স্কুল, কলেজ ও বাজারে যাতায়াত করে। জনস্বার্থে রাস্তাটি দ্রæত মেরামতের দাবি জানাই। একই অর্থবছরে টেংরাটিলার ব্যবসায়ী জয়নালের বাড়ি হতে করিমের বাড়ি পর্যন্ত মাটির রাস্তা নির্মাণে কর্মসৃজন প্রকল্পের আওতায় ২ লাখ ৩২ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই প্রকল্পেরও সভাপতি সংরক্ষিত ইউপি সদস্য জরিনা বেগম। বরাদ্দের পুরো টাকা উত্তোলন করা হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে উল্লেখিত জায়গায় বোরো ফসলি জমি ছাড়া রাস্তার কোনো চিহ্ন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এখানে রাস্তা নির্মাণ কাজে বরাদ্দ আসছে এই প্রথম জানলাম। এই কয়েক বছরে এখানে রাস্তার কোনো কাজ শুরু হতে দেখিনি। স্থানীয় বাসিন্দা শাফি উদ্দিন জানান, আমার জানামতে এখানে রাস্তা নির্মাণে এখন পর্যন্ত কোনো কাজ শুরু হয়নি। ইউপি সদস্য হযরত আলী জানান, আমি নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। এখানে কাজটা কোন পর্যায়ে আছে আমি জানিনা। তবে আমার জানা মতে এখানে কোনো কাজ হয়নি। এব্যাপারে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে দোয়ারাবাজার উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আম্বিয়া আহমেদ প্রতিবেদককে জানান, আপনি একটু খবর নেন, এটা সম্ভবত রেজুলেশনের মাধ্যমে পরিবর্তন করে অন্যদিকে কাজ করানো হয়েছে। টেংরাবাজার বঙ্গবন্ধু ক্লাবের আসবাবপত্র ক্রয়ে টিআর কাবিখা প্রকল্পের আওতায় প্রথম পর্যায়ে ২০১৯-২০ অর্থ বছরে ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি সংরক্ষিত ইউপি সদস্য জরিনা বেগম ও সাধারণ সম্পাদক বজলুল মামুন। এই বরাদ্দের পুরো টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক বজলুল মামুন জানান, ‘ক্লাবের বরাদ্দের টাকা নিয়ে চেয়ার ও টেলিভিশন ক্রয় করা হয়েছে। ক্লাবের উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে।’ তবে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির দুই সদস্য মানিক ও বেদন মিয়া অভিযোগ করেছেন, টাকা উত্তোলনের সময় তাদের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। তাদেরকে এবিষয়ে কিছুই জানানো হয়নি। মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে বঙ্গবন্ধু ক্লাবের সভাপতি তাজুল ইসলাম বিএসসি জানান, ক্লাবে ইউপি চেয়ারম্যান কর্তৃক ২০টি প্লাস্টিকের চেয়ার প্রদান করা হয়েছে এছাড়া একটি টেলিভিশন দিবেন বলে তিনি আশ্বস্ত করেছেন।
চলতি বছরের জুন মাসে টেংরাবাজারের মাছ বাজার অংশে মাটি ভরাটে কাবিখা প্রকল্পের আওতায় দ্বিতীয় পর্যায়ে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকার বরাদ্দ অনুমোদন করা হয়। এই প্রকল্পের সভাপতি সুরমা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খন্দকার মামুনুর রশীদ নিজেই। ইতোমধ্যে বরাদ্দ থেকে ৬২ হাজার টাকা উত্তোলন করা হলেও এখনোব্দি বাজারের মাটি ভরাট কাজ শুরু হয়নি। টেংরাবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মেজবাউল গণি সুমন জানান, পিআইয়ো অফিসের মাধ্যমে জানতে পেরেছি বাজারে মাটি ভরাট কাজে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। মাছ বাজারের মাটি ভরাটের কোনো কাজ এখন পর্যন্ত শুরু হয়নি।
মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি সংরক্ষিত ইউপি সদস্য জরিনা বেগম মোবাইলে বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। প্রকল্পের কাজের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রতিবেদকে শাসিয়ে বলেন, আমি সাতটা প্রকল্পের সভাপতি। আপনারা যদি আমাকে কিছু করতে চান আমার চেয়ারম্যান আছে। প্রকল্প আমি খেয়ে ফেলছি। আমার বিরুদ্ধে মামলা করে দেন। মামলা যদি শেষ করে আসতে পারি তাহলে আসব না হয় বাদ। আপনারা আমাকে কল দিবেন না। এব্যাপারে সুরমা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মামুনুর রশীদের মোবাইল নাম্বারে একাধিক বার কল দেওয়া হলেও সংযোগ না পাওয়া যাওয়ায় তার বক্তব্য নেওয়া যায়নি। সরেজমিনে অনুসন্ধানে গিয়ে প্রতিবেদনে উল্লিখিত প্রকল্পের দৃশ্যমান কোনো কাজ না পাওয়া গেলেও মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আম্বিয়া আহমদ জানান সবকটি প্রকল্পের কাজ হয়েছে। তবে এবিষয়ে অফিসে প্রতিবেদকের সাথে সামনাসামনি আলাপ করবেন বলে তিনি জানান।