শান্তিগঞ্জে অশান্ত সুনামগঞ্জ

চৌধুরী আহমদ মুজতবা রাজী, সুনামগঞ্জ ::
উপজেলার নাম দক্ষিণ সুনামগঞ্জ। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার শরীর কেটে এ উপজেলার জন্ম। সাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছিলো দিরাই ও জগন্নাথপুরের কিছু অংশ। উপজেলা হিসেবে জন্মের বয়সও বেশি হয়নি। এখনই ‘দক্ষিণ বাহু’ ভুলতে চাইছে সুনামগঞ্জকে। নিজের পরিচয়ে ছাড়িয়ে যেতে চাইছে সুনামগঞ্জকে। এমনকি নামের সাথে সুনামগঞ্জকে জড়িয়ে রাখতেও আপত্তি। খুঁজে নেওয়া হয়েছে নতুন নামও। প্রস্তাবিত নাম শান্তিগঞ্জ। সেই শান্তিগঞ্জ অশান্তির বাতাস বইয়ে দিচ্ছে সুনামগঞ্জে। সুনামগঞ্জের ভাগের সব কিছুই কেড়ে নিতে চাইছে শান্তিগঞ্জ। জেলা হিসেবে ভাগে পাওয়া টেক্সটাইল ইন্সটিটিউট, মেডিকেল কলেজ, বিশ^বিদ্যালয় সবকিছুই নিজের বুকে আগলে রাখতে চাইছে শান্তিগঞ্জ।
দেশের প্রান্তিক অঞ্চল সুনামগঞ্জ অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে রয়েছে। পেছনের ইতিহাস পেছনে রেখে সুনামগঞ্জের যখন সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে তখন বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ঘরের শত্রæ বিভীষণ’ দক্ষিণ সুনামগঞ্জ। সব আলো নিজের কাছে রেখে সুনামগঞ্জকে পুরো অন্ধকারে রাখতে চাইছে এ উপজেলা। দেশের প্রতিটি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার সরকারি ঘোষণার পর সুনামগঞ্জেও আশার পালে হাওয়া লাগে। কিন্তু সে হাওয়া সদর উপজেলা পর্যন্ত পৌঁঁছার আগে থেমে যায় ‘শান্তিগঞ্জে’। সুনামগঞ্জ থেকে মন্ত্রিসভায় একমাত্র প্রতিনিধিত্বকারী এম এ মান্নানের নিজের এলাকা এটি। সুনামগঞ্জের সকল স্বপ্ন বন্দি হয়ে পড়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের নিজের এলাকা শান্তিগঞ্জে। ক্যাবিনেটের প্রভাবশালী এ সদস্যের চাওয়ার কারণে সুনামগঞ্জে হতে যাওয়া সকল প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে শান্তিগঞ্জকে।
শান্তিগঞ্জের ভাগ্যই বলতে হবে। সিলেট বিভাগের কোথাও কোনো বিশ^বিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউট বা বড় কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোনো উপজেলা শহরে গড়ে উঠেনি। সুনামগঞ্জে টেক্সটাইল ইন্সটিটিউট, মেডিকেল কলেজ, বিশ^বিদ্যালয় হবে। টেক্সটাইল ইন্সটিটিউট হচ্ছে দক্ষিণ সুনামগঞ্জে, মেডিকেল কলেজ ও তাই (দক্ষিণ সুনামগঞ্জ লাগোয়া ও সদর উপজেলার শেষ সীমানায়), বিশ^বিদ্যালয় এর স্থান এখনো নির্ধারিত হয়নি তবে সাধারণ মানুষের আশঙ্কা সেটিও সদরের ভাগ্যে জুটবে না। হলে দক্ষিণ সুনামগঞ্জেই হবে।
মাত্র ২৫৯.০৫ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের উপজেলা দক্ষিণ সুনামগঞ্জ। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থার দোহাই দিয়ে এবং জেলার মধ্যবর্তী অঞ্চল দাবি করে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ সবসময়ই প্রাধ্যান্য পাচ্ছে। অথচ মাত্র ৩টি উপজেলা থেকে জেলা শহরে পৌছাতে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ হয়ে যেতে হয়। বাকি ৭টি উপজেলা আলাদা রাস্তা ব্যবহার করে। মহাসড়কের হিসেবে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ কোন অবস্থাতেই মধ্যবর্তী অঞ্চল নয়। সুনামগঞ্জ সদরের লোকজন যদি ছাতকের রাস্তা ব্যবহার করে তবে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ হয়ে কাউকেই বিভাগীয় শহর সিলেটে যেতে হবে না। তখন দক্ষিণ সুনামগঞ্জ হবে এ জেলার ‘কানা ছেলে’ আয়তনের দিক দিয়েও বড় নয় দক্ষিণ সুনামগঞ্জ। জেলার ২য় ক্ষুদ্রতম উপজেলা দক্ষিণ সুনামগঞ্জ। তবে কী কারণে এমন সম্ভাবনায় অঞ্চল হিসেবে প্রাধান্য পাচ্ছে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ। শুধু পরিকল্পনামন্ত্রীর বাড়ির এলাকা বলেই কি? অনেকের মনেই এ প্রশ্ন। দক্ষিণ সুনামগঞ্জ যেখানে তরতরিয়ে এগিয়ে চলেছে সেখানে মন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকার অংশ জগন্নাথপুর উপজেলার অবস্থা খুবই খারাপ। কাঠামোগত উন্নয়ন দুরে থাক, কিছুদিন পর পর সড়ক সংস্কারের দাবিতে পরিবহন ধর্মঘটের মতো ঘটনা নিয়মিত ঘটে ওখানে।
শান্তিগঞ্জের প্রাধান্যে নিজেদের বঞ্চিত মনে করছেন সুনামগঞ্জবাসী। জমে থাকা ক্ষোভ থেকে রোববার সুনামগঞ্জ শহরের আলফাতউদ্দিন স্কোয়ার (ট্রাফিক পয়েন্ট) প্রতিবাদের জনসমুদ্রে পরিণত হয়। সেখানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সুনামগঞ্জ-৪ আসনের (সুনামগঞ্জ-বিশ^ম্ভরপুর) সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ শিক্ষামন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে বলেন, পরিকল্পনামন্ত্রী শুধু শান্তিগঞ্জে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লিখিত আবেদনই দেননি, কোন মৌজায় হবে তাও নির্ধারণ করে দিয়েছেন। পীর মিসবাহ বলেন, আগামী ৮ নভেম্বর সংসদে বিল পাশের জন্য উত্থাপন হলে জেলা সদরে প্রতিষ্ঠার জন্য সংশোধনী দেবো। একই সঙ্গে আমাদের শেষ ভরসার স্থল প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করবো সুনামগঞ্জের গণমানুষের প্রাণের দাবি গ্রহণ করে সুনামগঞ্জ সদরে যেনো বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়।
তিনি আরো বলেন, অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান শান্তিগঞ্জের দুই কিলোমিটারের মধ্যে স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। টেক্সটাইল ইন্সটিটিউট, বিআরটিএ অফিস কাম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, কারিগরী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, যুব মহিলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, দুটি বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র, মুজিব কেল্লা- সবগুলো প্রতিষ্ঠানই জেলা সদরকে বঞ্চিত করে হয় শান্তিগঞ্জ, না হয় শান্তিগঞ্জের পাশে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যে কারণে আমরা বসে থাকতে পারি না। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর দেয়া মেডিকেল কলেজ নামে জেলা সদরে হলেও শান্তিগঞ্জের দুই কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সব উপহার শান্তিগঞ্জে নিলে জনগণ মানবে না।