বেওয়ারিশ লাশ: মৃত্যু বেদনার, বিদায় অসম্মানের


চৌধুরী আহমদ মুজতবা রাজী, সুনামগঞ্জ ::


তারও হয়তো সব আছেন- মা আছেন, বাবা আছেন হয়তো ঘরে প্রিয়তমা স্ত্রীও আছেন, আদরের সন্তানও হয়তো রয়েছে। কোনো একদিন হঠাৎ করে তিনি হারিয়ে গেলেন, কোনো খোঁজ নেই। চারদিকে সন্ধান করেও তার কোনো খবর পায়নি পরিবারের লোকজন। তারা অপেক্ষায় আছেন, একদিন তিনি ফিরে আসবেন, দরজায় কড়া নাড়বেন। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনলেই ছুটে আসে ছেলে। মা হাঁক ছাড়েন কে এলো রে। কিন্তু তারা দরজা খুলে হতাশ হন। প্রিয় সে মানুষটি আর আসেন না।
সেই মানুষটি হয়তো অজ্ঞাত পরিচয় হিসেবে পড়ে আছেন কোনো হাসপাতালের মর্গে। সড়ক দুর্ঘটনা, রেল লাইনে কাটা পড়ে, লঞ্চ ও নৌকাডুবি কিংবা পানিতে ডুবে মারা যান অনেকে। এসব ঘটনায় নিহতদের অনেকেরই পরিচয় মেলে না। আবার পূর্ব শত্রুতা কিংবা অপহরণের পরেও অনেককে হত্যার পর লাশ ফেলে দেয়া হয় যেখানে সেখানে। অনেক ক্ষেত্রে পরিচয় উদঘাটন না হয় সেজন্য লাশের চেহারা বিকৃত করে ফেলে দুর্বৃত্তরা। পরিচয় না পেয়ে একসময় হয়তো দাফন করা হয় বেওয়ারিশ হিসেবে। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের সৎকার হয় অসম্মানের সাথে, অবহেলায়। দেশের প্রান্তিক জেলা সুনামগঞ্জে এমনই অবহেলার শিকার হন প্রাণহীণ ‘বেনামি’ মানুষগুলো।
বেওয়ারিশ লাশ ময়না তদন্তের জন্য সদর হাসপাতালের মর্গে আনা হয়। অনেক সময় ময়না তদন্ত সম্পন্ন করার জন্য ডাক্তার না থাকলে লাশ মর্গে রাখতে হয়। তখন নানাবিধ ভোগান্তিতে পড়তে হয়। টাকা ছাড়া মর্গে লাশ রাখা যায় না। কেউই এর দায়িত্ব নিতে চান না। পরিচয়বিহীন লাশ হওয়ায় অনেক সময় ময়না তদন্ত শেষে সেলাই না করেই লাশ হস্তান্তরের চেষ্টা করা হয়।
তাদের সৎকারের ক্ষেত্রেও যেনো কারো কোনো দায় নেই। লাশ দাফনের জন্য নির্দিষ্ট কোনো জায়গাও নির্ধারিত নেই সুনামগঞ্জে। তবে কেউ কেউ দায় নিতে চায়। মানবিকতার তাগিদ থেকে সুনামগঞ্জে বেওয়ারিশ লাশ দাফ দাফনের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে খিদমাতু মাজেদ বিন নুরুল নামে একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠার পর আড়াই বছরে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় অর্ধশতাধিক বেওয়ারিশ লাশ সংগ্রহ করে নিজস্ব অর্থায়নে কবরস্থ করেছে। এ কাজ করতে গিয়ে প্রায়শই নানাবিধ প্রতিকুলতার মুখোমুখি হতে হয় তাদের। প্রায়শই তাদের পচা, গলা দেহ কবরস্থ করতে হয়। সীমিত সামর্থ্য নিয়ে লাশ সংগ্রহ, লাশ পরিবহন করা হয়ে উঠে কষ্টসাধ্য।
খিদমাতু মাজেদ বিন নুরুলের পরিচালক ইব্রাহিম মাজেদ জানান, পরিবারের নিজস্ব আয়ের একটি অংশ বরাদ্দ রেখেছি আমরা এ কার্যক্রমের ব্যয় মেটানোর জন্য। সামাজিক দায়িত্ব হিসেবেই আমরা এ কাজ পরিচালনা করে থাকি। থানা থেকে ফোন পাওয়ার পর আমরা ছুটে যাই সদর হাসপাতালে। ময়না তদন্ত শেষে এই লাশ সংগ্রহ করে নিজস্ব পরিবহন না থাকায় ভাড়া করা ঠেলা গাড়ীতে তুলে নিয়ে আসতে শান্তিবাগস্থ কেন্দ্রীয় কবরস্থানে। অধিকাংশ সময়ই পচা, গলা, বিকৃত, দুর্গন্ধযুক্ত লাশ সংগ্রহ করতে হয়। যা অমানবিক ও দাফনকাজে ভোগান্তির সৃষ্টি করে।
তিনি আরো বলেন, লাশ দাফনের জন্য নির্দিষ্ট কোন জায়গা নির্ধারিত নেই। লাশ দাফনের জন্য জায়গা না থাকলে মর্গ থেকে আমরা লাশ নিয়ে কী করব। কেন্দ্রীয় কবরস্থান (মরাটিলা নামে পরিচিত) এ লাশ দাফন করে থাকি আমরা। প্রায়শই মাটি খুড়লে অন্য কবর থেকে লাশে হাড্ডি, মাথার খুলি বেরিয়ে পড়ে। খানাখন্দে ভর্তি এ কবরস্থান। এ সমস্যার সমাধানে কবরস্থানে কবরস্থানের ব্যবস্থাপনা উন্নত করা সহ বেওয়ারিশদের জন্য নির্ধারিত জায়গা থাকা উচিত। তিনি জানান, আলাদা কবরস্থান ও লাশবাহী গাড়ির জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছেন। তবে তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি হয়নি।
ইব্রাহিম মাজেদ বলেন, একটি লাশবাহী গাড়ি পাওয়া গেলে আমাদের প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে গাড়ীর জ্বালানি, ড্রাইভারের বেতন ইত্যাদি বহন করা হবে।
সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন বলেন, সেলাই না করে ক্ষতবিক্ষত লাশ হস্তান্তরের বিষয়টি আমার জানা নেই। এ ব্যাপারে কেউ অভিযোগ করেনি। বেওয়ারিশ হিসেবে চিহ্নিত লাশ পুলিশ নিয়ে আসে, ময়না তদন্ত শেষে পুলিশ নিয়ে যায়। বিষয়টি আমি খতিয়ে দেখবো।
কেন্দ্রীয় কবরস্থানের ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নাদের বখত জানান, কেন্দ্রীয় কবরস্থানে এলাকার দুঃস্থ জনগনের কবর দেয়া হয়। শহরের বিভিন্ন মহল্লায় কবরস্থান রয়েছে। কেন্দ্রীয় কবরস্থানের সৌন্দর্য্যবর্ধন ও সংস্কারের জন্য ৫ (পাঁচ) কোটির পরিকল্পনা গ্রহণ করে অনুমোদনের জন্য মন্ত্রনালয়ে পাঠানো হয়েছে। পরিকল্পনা অনুমোদিত হলে কবরস্থানের রক্ষনাবেক্ষণ সহজ হবে। পৌরসভার নিজ উদ্যোগে কিছুদিন পুর্বে কেন্দ্রীয় কবরস্থানের গেইট নির্মাণ করা হয়েছে। ডিসেম্বরের পুর্বেই এর ভেতরের রাস্তা তৈরী করার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি আরো বলেন, বেওয়ারিশ লাশের কোন কবরস্থান বলে আলাদা কবরস্থান বা সীমানা নির্ধারণ করে আলাদা করার পরিকল্পনা পৌরসভার নেই। আমরা চাই নাম পরিচয় না থাকলেও একজন নাগরিক হিসেবে তিনি যেন প্রাপ্য সম্মানটুকু পান।